সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬,

উত্তরের নদ-নদীতে মিলছে ইলিশ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৭:০১ পিএম

উত্তরের নদ-নদীতে মিলছে ইলিশ

ছবি: সংগৃহীত

উত্তরের নদ-নদীতে ইলিশ ধরা পড়ায় রংপুর অঞ্চলের জেলেপল্লিতে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। প্রজনন সুরক্ষায় দেশব্যাপী সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং ২০০৩-০৪ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাবে সারা দেশে ইলিশের সামগ্রিক উৎপাদন বেড়েছে। চলতি বছর ইলিশ আহরণ আগের চেয়ে বৃদ্ধির আশার মধ্যেই লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার ১১টি উপজেলায় জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঐতিহ্যবাহী এই রুপালি মাছ। 

দক্ষিণাঞ্চলের নোনাজলের মাছ হিসেবে পরিচিত হলেও উত্তরের তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনায় দুর্লভ এ সম্পদের সন্ধান মেলায় প্রান্তিক মৎস্যজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি উদ্দীপনা। নদীর নাব্যতা হ্রাস ও আধুনিক সরঞ্জামের অভাব এই সম্ভাবনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামের ছয়টি, গাইবান্ধার চারটি এবং লালমনিরহাটের একটি উপজেলায় এখন নিয়মিত ইলিশ মিলছে। এর মধ্যে রয়েছে কুড়িগ্রামের সদর, নাগেশ্বরী, উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর; গাইবান্ধার সদর, সুন্দরগঞ্জ, সাঘাটা ও ফুলছড়ি এবং লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলা। গত মৌসুমে এসব এলাকায় মোট ৪৮ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। সাধারণত প্রতি বছর এই তিন জেলার নদীগুলো থেকে ৫০ থেকে ৬০ টন ইলিশ পাওয়া যায়, যা অন্যান্য উপকূলীয় জেলার তুলনায় সীমিত।

গত ২৯ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হওয়ার পর জেলেরা আবার নদীতে জাল ফেলছেন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে এই তিন জেলার এক হাজার ৬০০ নিবন্ধিত জেলের প্রত্যেককে খাদ্য সহায়তা হিসেবে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। তবে অনেক মৎস্যজীবী নৌকার অভাবে সময়মতো নদীতে নামতে পারছেন না।

কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ জানান, উত্তরের নদীগুলোতে মাঝেমধ্যেই ইলিশের দেখা মিলছে। তবে প্রধান অন্তরায় নদীর নাব্যতা সংকট এবং স্থানীয় জেলেদের প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার ঘাটতি। সমস্যাগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন মন্ত্রণালয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ থেকে সাত বছর আগেও তিস্তার গঙ্গাচড়া মহিপুর অংশে ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সেখানে উপস্থিতি অনেকটাই বিরল। অবসরপ্রাপ্ত মৎস্য জরিপ কর্মকর্তা জুবায়ের আলী জানান, ইলিশ মূলত সাগরের মাছ হলেও মিঠাপানিতে ডিম ছাড়তে প্রবেশ করে। রংপুর অঞ্চলে বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্র খরস্রোতা রূপ ধারণ করায় সাগরের সাথে সংযোগের সুবাদে তখন ইলিশের ঝাঁক উজানে উঠে আসে। তিস্তাও অতীতে খরস্রোতা ছিল এবং সাগর থেকে ইলিশ আসত। নদীগুলোর গভীরতা ও পানির প্রবল টান ফিরিয়ে আনতে পারলে উত্তরের অববাহিকা মাছের বড় অভয়াশ্রমে পরিণত হবে।

বাজারে বিভিন্ন আকারে মিলছে এই মাছ।

উলিপুরের মাঝিপাড়া এলাকার মৎস্যচাষি নয়ন চন্দ্র জানান, এ মৌসুমে মাছ তুলনামূলক কম উঠছে। ব্রহ্মপুত্রে ধরা পড়া এক কেজি ওজনের ইলিশ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে। কুড়িগ্রামের আরেক জেলে কাঞ্চন কুমার জানান, বর্তমানে মাছ ধরার নৌকা কমে যাওয়ায় খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন কমপক্ষে দুই হাজার টাকা ব্যয়ের পাশাপাশি নৌকার ভাড়ার খরচ মেটাতে মাছের প্রাপ্তিতে পোষায় না। বর্তমানে ব্রহ্মপুত্রের আধা কেজির নিচের ইলিশ প্রতি কেজি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং বড় আকারের মাছ এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কালীপূজা পার হলে হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া নদীতে আর তেমন মাছ মিলবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তাপাড়ের জেলে আব্দুল গনি জানান, চলতি মৌসুমে তারা তিস্তা থেকে ১৫ কেজি ইলিশ ধরতে পেরেছেন। কিন্তু তীব্র নাব্যতা সংকট ও নৌকার অভাবে তারা পর্যাপ্ত জাল ফেলতে পারছেন না। নাগেশ্বরী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সাহাদত হোসেন জানান, রৌমারী ও রাজিবপুরের তুলনায় তার এলাকায় মাছ প্রাপ্তির হার বেশ কম।

রংপুর মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র খনন করার পরিকল্পনা সরকারের বিবেচনাধীন রয়েছে। নদীর গভীরতা পুনরুদ্ধার করা গেলে এই তিন জেলার নদীগুলো ইলিশসহ দেশীয় সব প্রজাতির মাছের জন্য স্থায়ী প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রে রূপ নেবে।