বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬,
সীমান্তে বাঘ আতঙ্ক

তিন দিনেও মেলেনি বাঘের সন্ধান হাতীবান্ধা সীমান্তে চরম আতঙ্ক

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ১১:৩৯ পিএম

তিন দিনেও মেলেনি বাঘের সন্ধান হাতীবান্ধা সীমান্তে চরম আতঙ্ক

ছবি: সংগৃহীত

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার সীমান্ত পেরিয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়া বন্য চিতা বাঘটির সন্ধান টানা তিন দিনেও মেলেনি।

সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে ভারতে ফিরে যেতে না পেরে বাঘটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই কোথাও আত্মগোপন করে আছে বলে নিশ্চিত ধারণা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে পুরো সীমান্ত এলাকা জুড়ে থমথমে পরিবেশ ও তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।

বাঘটি সর্বশেষ যে স্থানে প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল, সেখান থেকে এক থেকে চার কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই রয়েছে বিস্তীর্ণ ও ঘন শালবন। এলাকাবাসীর জোরালো আশঙ্কা, ড্রোনের নজরদারি ও জনতার শোরগোল এড়িয়ে চিতা বাঘটি ওই গহীন শালবনের ভেতর কিংবা আশপাশের নিবিড় ঝোপঝাড়ে ওত পেতে রয়েছে।

বাঘের ভয়ে হাতীবান্ধার হাজারো মানুষের রাতের ঘুম কার্যত হারাম হয়ে গেছে।

নানা প্রান্তে বাঘ দেখতে পাওয়ার নতুন নতুন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে। নিজেদের এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাঠিসোঁটা, বাঁশের কঞ্চি ও টর্চলাইট হাতে দল বেঁধে রাতভর পাহারা বসিয়েছেন স্থানীয় যুবকরা।

সীমান্তবর্তী অঞ্চলের একাধিক বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বাঘটি বাংলাদেশে প্রবেশের পর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এবং স্থানীয়দের তৎপরতার কারণে সীমান্তসংলগ্ন জঙ্গল বা কাঁটাতারের দিকে পুনরায় ফিরে যেতে পারেনি। আমঝোল সীমান্ত ও সিঙ্গিমারি যে স্থানটিতে বাঘটি শেষবারের মতো দেখা গিয়ে হঠাৎ নিখোঁজ হয়, সেখান থেকে হাঁটা দূরত্বেই রয়েছে চার কিলোমিটার শালবন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, দিনের আলোতে কৌতূহলী মানুষের চিৎকার থেকে বাঁচতে প্রাণীটি শালবনের ঘন লতাপাতায় গা ঢাকা দিয়েছে এবং রাতের অন্ধকারে খাদ্য বা আশ্রয়ের খোঁজে বের হচ্ছে।

সিঙ্গিমারি এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা সোলায়মান আলী জানান, বাঘটি ভারতে ফেরত যেতে পারেনি। ওপারে কাঁটাতার আর এপারে মানুষের হইচই দেখে ভয় পেয়ে সীমান্ত পার হতে না পেরে কাছেই থাকা শালবনে ঢুকে পড়েছে। যেখান থেকে বাঘ নিখোঁজ হয়েছে, সেখান থেকে শালবনের দূরত্ব মাত্র চার কিলোমিটারের মতো। সেখানেই ওটা ওত পেতে আছে। ফলে দিনের বেলাতেও একা বের হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

আমঝোল গ্রামের যুবক আলামিন হোসেন বলেন, রোববার রাতে ড্রোনে যা দেখা গিয়েছিল, তা মূলত চিতা বাঘ। ভারতের দিকে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বাঘটি যেখানে শেষ দেখা গেছে, সেখান থেকে হাত বাড়ালেই শালবন। তাদের ধারণা, গহীন শালবন কিংবা ঘন ঝোপের ভেতরেই এটি লুকিয়ে রয়েছে, যার কারণে রাতে কেউ ঘুমাতে পারছেন না।

বাঘ কোনো মুহূর্তে লোকালয়ে ঢুকে শিশু কিংবা গৃহপালিত গবাদিপশুর ওপর হামলা চালাতে পারে—এমন আতঙ্কে হাতীবান্ধার গ্রামগুলোতে সন্ধ্যার পরপরই নেমে আসছে শুনশান নীরবতা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের চৌকাঠ পেরোচ্ছেন না। মসজিদ থেকেও মাইকিং করে বাঘের উপস্থিতি নিয়ে সতর্কবার্তা প্রচার করা হয়েছে।

গোতামারী এলাকার বাসিন্দা মজিবর রহমান জানান, ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে রাতে তারা উদ্বেগে ঘুমাতে পারছেন না। কখন শালবন থেকে বেরিয়ে কার ওপর আক্রমণ চালায়, তা নিয়ে সবসময় শঙ্কা কাজ করছে। রাতে গ্রামের যুবকেরা দল বেঁধে টর্চ জ্বেলে পাহারা দিচ্ছে। একটি গাছের পাতা নড়লেও সবার বুক কেঁপে উঠছে।

একই এলাকার গৃহিণী রাশেদা বেগম জানান, রোববার তিনজন আহত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পর থেকেই চরম আতঙ্ক ঘিরে ধরেছে। গরু-ছাগল গোয়ালে রেখে দরজায় শক্ত তালা ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে এবং রাতে ঘরের বাতি নেভাতেও ভয় পাচ্ছেন তারা।

সোমবার ও মঙ্গলবার রাতে সিঙ্গিমারি এলাকায় বাঘ দেখার নতুন গুঞ্জনে ভীতি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, সিঙ্গিমারির শালবনের ভেতর বা কাছেই বাঘ দেখার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কেউ এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করতে পারেনি। পুলিশ ও বিজিবি টহল দিলেও বাঘ সরাসরি আটক না হওয়া পর্যন্ত কেউই স্বস্তি পাচ্ছেন না।

গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকার নাইন মঙ্গলবার দুপুরে জানিয়েছিলেন, সিঙ্গিমারিতে বাঘের খবরের পর বিশেষ দল পাঠানো হয়। নিখোঁজ স্থানসংলগ্ন শালবন ও আশপাশে ড্রোন এবং থার্মাল ইমেজিং প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয়দের সহায়তায় অভিযান জোরদার করা হয়েছিল। তবে বন বিভাগ ও বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরা অভিযানে থাকার পর বুধবার সকালে তল্লাশি স্থগিত করে ঢাকায় ফিরে গেছেন।

এর আগে সোমবার রাতে ড্রোনে স্পষ্ট অবস্থান না মিললেও বিজিবি, পুলিশ ও বন বিভাগ যৌথভাবে নজরদারি চালায়।

এদিকে উদ্ধার অভিযান চলাকালে ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাদের দাবি, কৌতূহলী জনতার ভিড় ও ড্রোনের তল্লাশির সময় বিপুল পরিমাণ জমির পাকা ও আধা-পাকা ধান নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা দ্রুত সরকারি ক্ষতিপূরণের দাবি তুলেছেন।

লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহা: রাশেদুল হক প্রধান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বাঘের ভয় পাওয়ার কারণ নেই, বিজিবির পাশাপাশি পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের কোথাও বাঘ লুকিয়ে থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত রোববার (২৫ অক্টোবর) বিকেলে হাতীবান্ধা উপজেলার গোতামারী ইউনিয়নের আমঝোল সীমান্তের ৯০৫ নম্বর আন্তর্জাতিক পিলারের কাছে ভারতের দিক থেকে আসা বাঘটি প্রথম চড়াও হয়। ধানক্ষেতে ছাগল আনতে গেলে আমঝোল গ্রামের শরিফা বেগমের ওপর প্রাণীটি ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়ে নজরুল ইসলাম ও আফসার আলী গুরুতর জখম হন। তারা বর্তমানে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওই ঘটনার পর বিজিবি ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। মধ্যরাতে ড্রোনের ক্যামেরায় বাঘের দেখা মিললেও ঘন কুয়াশা ও শালবনের কারণে প্রাণীটি পুনরায় দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়।