নভেম্বর ২, ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
মজুরি বৃদ্ধি ও বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলনের পঞ্চম দিনে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে শতাধিক পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে দেড় শতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে আহত হয়েছেন শিল্প পুলিশের কয়েকজন সদস্যও।
সংঘর্ষের জেরে নরসিংহপুর এলাকায় একটি তৈরি পোশাক কারখানার কাভার্ড ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এই চরম অস্থিরতার মুখে সাভার ও আশুলিয়ার দুই শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় নিউএজ কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি পালন শেষে কারখানা চত্বর থেকে বের হয়ে প্রথম বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে তারা মিছিল নিয়ে অনন্ত গ্রুপ ও হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা সড়ক অবরোধের চেষ্টা চালালে পুলিশের সঙ্গে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়, যা দ্রুত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সাভারের বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন আন্দোলনকারীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে।
দুপুর ১২টার দিকে নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে সড়কে থাকা একটি তৈরি পোশাক কারখানার কাভার্ড ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে পুরো শিল্পাঞ্চলে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অগ্নিকাণ্ডের পরপরই নিরাপত্তার স্বার্থে আশপাশের চালু থাকা অধিকাংশ কারখানায় তাৎক্ষণিক সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
শ্রমিকদের একটানা সড়ক অবরোধের ফলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
পরিস্থিতি দেখতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সাভারের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বাবু। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পতিত সরকারের দোসর ও বিশেষ বহিরাগত চক্র সাভার-আশুলিয়ার তৈরি পোশাক খাতকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে। শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত কর্মসূচিতে বহিরাগতরা অনুপ্রবেশ করে সরাসরি নাশকতা তৈরি করছে বলে দাবি করেন তিনি।
শিল্প পুলিশের কর্মকর্তারাও একই অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, উসকানিদাতা বহিরাগতরা জোরপূর্বক শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের করে এনে মহাসড়কে নামতে বাধ্য করছে, যার ফলে সাধারণ শান্তিপ্রিয় শ্রমিকরাও অনিচ্ছা সত্ত্বেও আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ছেন।
সংঘর্ষ চলাকালে ইটপাটকেলের সরাসরি আঘাতে শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার (অপারেশনস অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স) শোয়েব আহমেদ সামান্য আহত হন। তিনি জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং ইটের আঘাতে পুলিশের একাধিক সদস্য আহত হয়েছেন।
দুপুর দেড়টা পর্যন্ত পুরো শিল্পাঞ্চলে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল এবং বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা মুখোমুখি অবস্থানে ছিলেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি মোড়ে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে দুপুর দেড়টার দিকে বাইপাইল এলাকা থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা কারখানার নিয়মিত শ্রমিক নাকি বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে কয়েক দিন ধরেই সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে এই বিক্ষোভ চলছে। চলমান আন্দোলনের কারণে গত কয়েক দিনে সাভার ও আশুলিয়া এলাকার প্রায় ২৩০টি তৈরি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন