নভেম্বর ১, ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকাসহ তিন দফা দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ, অবরোধ ও সংঘর্ষের মুখে সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের অন্তত ২৭৭টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রোববার (১ নভেম্বর) দিনভর দুই শিল্পাঞ্চলে দফায় দফায় কর্মবিরতি ও সড়ক অবরোধের প্রেক্ষাপটে কারখানা কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।
এর মধ্যে সাভার ও আশুলিয়া এলাকার ১৭৭টি এবং গাজীপুরের ১০০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রেখে সাধারণ ছুটি দেওয়া হয়েছে। রোববার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং গাজীপুর শিল্প পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন।
শিল্পাঞ্চল আশুলিয়ায় সকাল থেকেই অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করে। সকালে নিশ্চিন্তপুর এলাকার আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইন ও নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকরা নিজ নিজ কারখানায় প্রবেশ করে প্রথমে কর্মবিরতি শুরু করেন। পরবর্তীতে তারা কারখানা চত্বর থেকে বের হয়ে এসে সড়কে নেমে পড়েন। একপর্যায়ে সংহতি প্রকাশ করে আশপাশের অন্যান্য পোশাক কারখানার শ্রমিকরাও এই আন্দোলনে যুক্ত হন।
দুপুর ১২টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক সড়কে অবস্থান নেন। সে সময় আন্দোলনরত শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালালে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ওই এলাকার ১৭৭টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয় বলে জানান আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া।
এদিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। পরে বিকেল পাঁচটার দিকে পুলিশ গিয়ে ব্যারিকেড সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করে।
অন্যদিকে গাজীপুরেও সকাল থেকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ, হরিণহাটি, মৌচাক, কোনাবাড়ীসহ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের একাধিক পয়েন্টে শ্রমিকরা জড়ো হয়ে অবরোধ তৈরি করেন।
বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কে বাঁশ ও কাঠে আগুন জ্বালিয়ে ব্যারিকেড দেন।
একপর্যায়ে বিভিন্ন যানবাহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি পুলিশ বক্স ও একটি গাড়িতে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দিতে গেলে সেখানেও দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ বাধে।
এমন অচলাবস্থার মধ্যে গাজীপুর এলাকার অন্তত ১০০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুর শিল্প পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, কোনাবাড়ী থেকে কালিয়াকৈরের পল্লীবিদ্যুৎ পর্যন্ত সড়কের পাশের কারখানাগুলোতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হলে মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জানমালের নিরাপত্তায় সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সোমবার থেকে কারখানাগুলো পুনরায় সচল হবে।
আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানান, তাদের প্রধান দাবি বর্তমান উচ্চ দ্রব্যমূল্যের বাজারে জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা। এর পাশাপাশি অযৌক্তিক কারণে শ্রমিক ছাঁটাই অবিলম্বে বন্ধ করা এবং কর্মীদের কালো তালিকাভুক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক অপতৎপরতা বন্ধের দাবিও তুলেছেন তারা।
সাভার ও আশুলিয়া এলাকার কমফোর্ট কালেকশন পোশাক কারখানার অপারেটর রাজু আহমেদ জানান, তাদের কারখানায় একজন হেলপারকে মাত্র আট হাজার থেকে সাড়ে আট হাজার টাকা মাসিক বেতন দেওয়া হয়, যেখানে অন্য কারখানায় তুলনামূলক বেশি। আবার অন্য প্রতিষ্ঠানে হাজিরা বোনাস এক হাজার ৫০০ টাকা দেওয়া হলেও তাদের দেওয়া হয় মাত্র ৫০০ টাকা। এই বৈষম্য ও জীবনযাত্রার চরম ব্যয়ের কারণেই তারা রাজপথে নেমেছেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু জানান, মূলত তিনটি প্রধান দাবিকে কেন্দ্র করে শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন। এর মধ্যে প্রধানতম দাবি হলো ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। তিনি উল্লেখ করেন যে এই দাবিকে কেন্দ্র করে মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে, তবে নির্ধারিত অধিকারের দাবিতে শ্রমিকরা রাস্তায় সক্রিয় অবস্থান নিয়েছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন