অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম
একটি খাল শুধু পানি চলাচলের পথ নয়, বরং তাকে ঘিরে বদলে যেতে পারে একটি গ্রামের কৃষি, জীবিকা, পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা। খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, যশোর ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকার খাল পুনর্খনন কর্মসূচি তেমনই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। স্থানীয় এক কৃষকের ভাষায়, এই খালের পানি যেন দুধের পানির মতো পবিত্র ও পুষ্টিকর, যা কৃষির প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে।
খুলনার ডুমুরিয়ার কাইনমারা খাল এর অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। খালটি খননের আগে যেখানে একটি মাত্র ফসল তুলতে কৃষকদের চরম বেগ পেতে হতো, সেখানে এখন অনায়াসে তিন থেকে চারটি ফসল ফলানো হচ্ছে। খননের আগে এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠ বর্ষার পানিতে প্লাবিত হয়ে থাকত এবং কৃষিকাজ ব্যাহত হতো। তবে খাল কাটার ফলে এখন সেখানে যেমন ভালো মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি ধান ও লক্ষ লক্ষ টাকার সবজি উৎপাদিত হচ্ছে।
নেদারল্যান্ডস সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া সফল ফর ইন্টিগ্রেটেড ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বা আইডব্লিউআরএম প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শুধু খালের প্রাণ ফিরে না আসে, বরং পুরো জনপদের জীবনযাত্রাও বদলে যায়। এই প্রকল্পের অধীনে ইতিমধ্যে বিরানব্বইটি খাল পুনর্খনন করা হয়েছে, যার সুফল ভোগ করছেন নব্বই হাজারের বেশি মানুষ। ছোট ছোট খালগুলো পুনর্খনন করে কৃষিাজে মিঠা পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি ব্যবস্থাপনা ও রিজেনারেটিভ বা পুনরুৎপাদনমূলক কৃষিকে উৎসাহিত করতে কাজ করছে সংস্থাটি।
এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় মানুষদের খাল খনন ও ব্যবস্থাপনায় সরাসরি যুক্ত করা, যাতে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এর টেকসই মালিকানা জনগণের হাতেই থাকে। স্থানীয় কৃষকরা নিজেদের কমিটির মাধ্যমে খাল পরিষ্কার ও দেখভালের কাজ পরিচালনা করছেন। এর অংশ হিসেবে তহবিল গঠনের জন্য দূরত্ব অনুযায়ী প্রতি কৃষকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অংকের চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে খালের রক্ষণাবেক্ষণেই ব্যবহার করা হয়।
আইডব্লিউআরএম প্রকল্প শুধু পানি নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধাই সহজ করেনি, বরং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের জ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই কৃষিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমার পাশাপাশি ফসলের ফলন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, আগে যেখানে বিঘা প্রতি আঠারো থেকে বিশ মণ ধান পাওয়া যেত, খাল কাটার ফলে এখন তা বেড়ে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ মণে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া জৈবসার ও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা রক্ষা এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব হয়েছে।
প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের উচ্চফলনশীল ও পরিবেশ সহিষ্ণু বিভিন্ন উন্নত জাতের বীজের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিরিধান একশ, বিরিধান একান্ন, বিরিধান বায়ান্ন, বিনা পনেরো এবং বিনা সেভেনের মতো উন্নত জাতের ধানের পাশাপাশি শাকসবজির বিভিন্ন আগাম, মধ্যম ও নাভি জাত চাষ করে সারা বছর লাভবান হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।
কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিপণনের বিশেষ ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এই প্রকল্পে। খাল সংলগ্ন সড়কে স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য বিশেষ বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকরা স্থানীয় ও দূরবর্তী বাজারের সঠিক মূল্য সম্পর্কে অবগত হয়ে সরাসরি ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারছেন, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে প্রতি চালানে শত শত টাকা সাশ্রয় করছে। স্থানীয় কৃষকদের এই অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে খাল সংলগ্ন এলাকায় নতুন রাস্তা ও কালভার্ট নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।
ডাচ রাষ্ট্রদূতের মতে, বর্তমান সরকারের খাল খনন কর্মসূচি গ্রামীণ মানুষের জন্য এক বিরাট অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই খাল পুনর্খনন কার্যক্রমের সফলতা প্রমাণ করে যে জলবায়ুর সাথে খাপ খাইয়ে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করলে গ্রামীণ জনপদের চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে দেওয়া সম্ভব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন