মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর, ২০২৬,
ক্যাকটাস চাষ

গ্রামে বসে ক্যাকটাস চাষে সফল আলতাফ, মাসে আয় ২০ হাজার

কৃষি ডেস্ক

অক্টোবর ৬, ২০২৬, ০১:০০ পিএম

গ্রামে বসে ক্যাকটাস চাষে সফল আলতাফ, মাসে আয় ২০ হাজার

ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি গভীর নেশা আর ভালোবাসা ছিল আলতাফের। চাকরির পাশাপাশি অনলাইনে অন্যদের ক্যাকটাস চাষের সাফল্য দেখে নিজেও আগ্রহী হন তিনি। প্রান্তিক একটি গ্রামে বসবাস করেও ব্যতিক্রমী কিছু করার তাগিদ থেকে শুরু করেন ক্যাকটাসের চাষ।

প্রাথমিকভাবে কয়েকটি গাছ সংগ্রহ করে শখের বশেই এর যত্ন নেওয়া শুরু করেন। বাণিজ্যিক পরিসরে করা যায় কিনা, সেই ভাবনা থেকে অনলাইনে একটি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন তিনি। প্রথম দিনেই তিন হাজার ৭০০ টাকার ক্রয়াদেশ আসে। অপ্রত্যাশিত এই সাড়া তার ভেতরে ক্যাকটাস নিয়ে কাজ করার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় তার পথচলা। বর্তমানে আলতাফের সংগ্রহে প্রায় ১২০ জাতের ক্যাকটাস রয়েছে। তিনি জানান, এসব গাছকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট। যেগুলোতে কাঁটা থাকে সেগুলো ক্যাকটাস, আর কাঁটাবিহীন পাতার মতো দেখতে গাছগুলোকে সাকুলেন্ট বলা হয়। দুটিই মূলত রসালো উদ্ভিদ।

তবে বর্তমানে ক্রেতাদের কাছে সাকুলেন্টের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। বিশ্বে প্রায় আড়াই হাজার জাতের ক্যাকটাস থাকলেও আলতাফের বাগানের প্রায় ৯৫ শতাংশ গাছেই ফুল আসে। মরু অঞ্চলের এই গাছগুলো পর্যাপ্ত রোদ ও উপযোগী আবহাওয়া পেলে ফুল দেয়। তবে বিদেশি জাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় মানিয়ে নিয়ে ফুল আসতে কখনো কখনো বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। আলতাফের বাগানে এখন শোভা পাচ্ছে কালঞ্চু নামের বিশেষ ক্যাকটাস। দেশি একক পাপড়ির পাশাপাশি ভারত ও থাইল্যান্ড থেকে আনা ডাবল পাপড়ির কালঞ্চুও রয়েছে তার কাছে, যা দেখতে অনেকটা গোলাপের মতো। মোট সাতটি রঙের কালঞ্চু রয়েছে এই বাগানে।

এছাড়া পাতার চারপাশ দিয়ে ফুলের কলি বের হওয়া ‘পিকক টেইল’ বা ময়ূরের লেজ নামের একটি ভিন্নধর্মী গাছও রয়েছে, যা দেখতে অনেকটা নাইট কুইনের মতো। কাঁটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অদ্ভুত সৌন্দর্যই ক্যাকটাসকে অন্যান্য গাছ থেকে আলাদা করেছে। বর্তমানে তার বাগানে দুই থেকে তিন লাখ টাকার গাছ রয়েছে। এগুলোর দাম শুরু হয়েছে সর্বনিম্ন ১৫০ টাকা থেকে।

বিদেশ থেকে আনা কিছু দুর্লভ জাতের সাকুলেন্ট ৩০০, ৫০০, ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ক্রেতাদের সুবিধার জন্য তিনি একটি টবের ভেতর দুই-তিনটি ভিন্ন জাতের ক্যাকটাস মিলিয়ে মিক্সড প্লান্টার তৈরি করেন। কাচের পাত্রে ছোট ঘর ও মানুষের অবয়ব দিয়ে মিনি বাগান বা টেরারিয়ামও তৈরি করছেন তিনি, যা টেবিলের সৌন্দর্য বাড়াতে দারুণ জনপ্রিয়। তিন বছর বয়সী আঙ্গুর ফলের মতো দেখতে একটি বিরল সাকুলেন্টও বড় একটি নার্সারি থেকে সংগ্রহ করেছেন তিনি। ক্যাকটাসের পরিচর্যা ও মাটি তৈরি সম্পর্কে আলতাফ জানান, সব ক্যাকটাসের জন্য প্রায় একই ধরনের মাটি ব্যবহার করা যায়। তবে স্টাপেলিয়া নামের বিশেষ জাতের ক্ষেত্রে বালির পরিমাণ কমিয়ে মাটির পরিমাণ বাড়াতে হয়।

রোগবালাই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব গাছে খুব একটা রোগ হয় না। মাঝে মাঝে ছত্রাকের আক্রমণ হলে ছত্রাকনাশক ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া গাছের বৃদ্ধি ও সুন্দর চেহারার জন্য ১৫ দিন পরপর নাইট্রোজেন, পটাশ ও কপার মিশ্রিত ‘এনপিকে’ সার স্প্রে করেন তিনি। ক্যাকটাসের পাশাপাশি ছায়াযুক্ত পরিবেশে তিনি অর্কিডের চাষও শুরু করেছেন। অর্কিডের জন্য আলাদা ছাউনি তৈরি করেছেন তিনি, কারণ এই গাছের জন্য প্রচুর পানি ও ছায়ার প্রয়োজন হয়। সকাল-বিকাল দুই বেলা পানি স্প্রে করতে হয়।

বর্ষাকাল অর্কিডের প্রধান মৌসুম। তার সংগ্রহে থাকা ‘অনসিডিয়াম’ বা ড্যান্সিং ডল/ড্যান্সিং লেডি জাতের ঝোপালো অর্কিডের দাম এক হাজার ৫০০ টাকার মতো। এছাড়া ডেনড্রোবিয়াম ও ভ্যান্ডা নামের অর্কিডগুলো বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায়। চাকরির পাশাপাশি গ্রামে বসে এই ক্যাকটাস ও অর্কিড বিক্রি করে আলতাফ প্রতি মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বাড়তি আয় করছেন।

ভবিষ্যতে তার পরিকল্পনা আরও বড়। বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া ১০০ থেকে ২০০ প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় ঔষধি গাছ সংগ্রহ করে সেগুলোর চারা উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করতে চান তিনি, কারণ দিন দিন রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় এসব ঔষধি গাছের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।