সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম
সমুদ্রপৃষ্ঠের ক্রমবর্ধমান উচ্চতা বৃদ্ধি মোকাবিলায় আরও জোরালো ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে সর্বসম্মতভাবে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করেছে জাতিসংঘ। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বরফের চাদর ক্ষয় এবং দুই মেরুর হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে সৃষ্ট এই চরম সংকট নিচু অঞ্চলের দ্বীপদেশগুলোর সার্বভৌম অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর ঐক্যমতে এই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জানানো হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় উচ্চতা প্রায় ৬ মিলিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এটিই এখন পর্যন্ত আধুনিক ইতিহাসের সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ড। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, কার্বন নিঃসরণ হ্রাসে তাৎক্ষণিক কোনো বড় পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বা তার চেয়েও বেশি বাড়তে পারে।
সংকটের গভীরতা ব্যাখ্যা করে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা হয়তো মিলিমিটারে পরিমাপ করা হয়, কিন্তু এর সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতি মাপা হয় লাখ লাখ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হওয়া, তাদের চিরচেনা জনপদ থেকে উচ্ছেদ হওয়া এবং একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ হারানোর মাধ্যমে। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, আমরা কোনো দেশ ও তাদের প্রাচীন সংস্কৃতিকে সমুদ্রের ঢেউয়ের নিচে চিরতরে হারিয়ে যেতে দিতে পারি না। একইভাবে কোটি কোটি বিপন্ন মানুষের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষাকেও পানির নিচে তলিয়ে যেতে দেওয়া অসম্ভব।
বিশ্বমঞ্চে গৃহীত এই সর্বসম্মত ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির বহুমুখী দুর্যোগ মোকাবিলায় একটি নতুন আন্তর্জাতিক গতি সঞ্চার করা। প্রস্তাবে ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমিয়ে আনা এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা ক্ষুদ্র দেশগুলোকে তাদের প্রাকৃতিক সহনশীলতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কেবল পরিবেশগত দিকই নয়, সাগরের পানির নিচে কোনো রাষ্ট্র ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ বিলীন হতে শুরু করলে তার আন্তর্জাতিক অবস্থান কী দাঁড়াবে, সে-সংক্রান্ত আইনি জটিলতারও যুগান্তকারী সমাধান করা হয়েছে এই প্রস্তাবে।
ঘোষণায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কোনো দেশের মূল উপকূলরেখা পেছনের দিকে সরে গেলেও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাদের নির্ধারিত সামুদ্রিক সীমানা আগের মতোই সম্পূর্ণ বহাল থাকবে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার কোনো ভৌগোলিক বা মৌলিক উপাদান সাগরে তলিয়ে গেলেও কেবল সেই কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার সার্বভৌমিক মর্যাদা হারাতে বাধ্য হবে না। ছোট দ্বীপদেশগুলোর জোট অ্যালায়েন্স অব স্মল আইল্যান্ড স্টেটসের পক্ষে অধিবেশনে বক্তব্য দেন পালাউয়ের প্রেসিডেন্ট সুরাঙ্গেল হুইপস জুনিয়র।
তিনি গভীর উদ্বেগের সাথে বলেন, চারপাশের জলরাশি ও সমুদ্রই যেসব উপকূলীয় রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মূল সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, তাদের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের এই অস্বাভাবিক উচ্চতা বৃদ্ধি সামগ্রিক জীবনপ্রবাহকেই নাটকীয়ভাবে বদলে দেওয়ার মতো নেতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে। তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, ঝুঁকিপূর্ণ ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সেই ১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক মালে ঘোষণার পর থেকেই অব্যাহত বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রের পানি বৃদ্ধি নিয়ে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে আসছে। একই সাথে তারা এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক আইন প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সার্বিক বাস্তবতায় তিনি জাতিসংঘে পাস হওয়া এই বিশেষ ঘোষণাকে একটি সত্যিকারের ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে স্বাগত জানান।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন