সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
সন্তানের হেফাজত বা জিম্মা নিয়ে পারিবারিক আদালতের দেওয়া ডিক্রির বিরুদ্ধে আপিলের আইনগত সুযোগ থাকলে সরাসরি হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন গ্রহণযোগ্য নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সন্তানের অভিভাবকত্ব ও জিম্মা ফিরে পেতে এক পোশাকশ্রমিক মায়ের করা হেবিয়াস করপাস রিট আবেদনের ওপর জারি করা রুল খারিজ করে বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় দেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে সম্প্রতি ২১ পৃষ্ঠার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বিচারপতি কাজী জিনাত হক, যার সাথে বেঞ্চের অপর বিচারক সম্পূর্ণ একমত পোষণ করেছেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন, শিশুর অভিভাবকত্ব বা জিম্মা সংক্রান্ত পারিবারিক আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার জন্য আইনে সুনির্দিষ্ট আপিল ফোরাম রয়েছে। প্রচলিত সেই আইনি বিকল্প ব্যবহার না করে সরাসরি হাইকোর্টে রিট দায়ের করা সমীচীন নয়। মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, সাভারের হেমায়েতপুরের একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করে। তাদের প্রথম সন্তানটি জন্মের পরই মারা গিয়েছিল। জন্মের পর শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে নবজাতককে প্রথমে সাভারের সুপার মেডিকেল হাসপাতালের বিশেষায়িত নবজাতক ইউনিটে এবং পরবর্তীতে ১৯ জুলাই ঢাকার মহাখালীর ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সে সময় সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সহিংস সংঘাত ও কারফিউ জারি থাকায় তৈরি হয় অস্বাভাবিক এক পরিস্থিতি। শিশুটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় নিরাপত্তা সংকট ও চিকিৎসার অর্থ সংগ্রহের জন্য পরিবারটি সাময়িকভাবে সেখান থেকে সরে যায় বলে রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে ১০ আগস্ট হাসপাতালে ফিরে গেলে প্রায় আট থেকে নয় লাখ টাকার বকেয়া বিল দাবি করা হয়। এরপর তারা পৈতৃক ভিটা বিক্রি করে অর্থের সংস্থান করতে নিজ জেলা ভোলায় চলে যান। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল স্থানীয় থানার মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, নবজাতকের বিষয়ে ২০২৪ সালের ২২ জুলাই তেজগাঁও থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল এবং ১৮ সেপ্টেম্বর শিশুটিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আজিমপুর ছোটমণি নিবাসে হস্তান্তর করা হয়।
এরই মধ্যে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক এক নিঃসন্তান দম্পতি শিশুটির অভিভাবকত্ব চেয়ে ঢাকার পারিবারিক আদালতে আবেদন করেন। রিটকারীর দাবি, মামলা দায়েরের মাত্র ১০ দিনের মাথায় একতরফাভাবে ওই দম্পতির অনুকূলে অভিভাবকত্ব, জিম্মা ও পাসপোর্ট ইস্যুর ডিক্রি দেওয়া হয়। সন্তানকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় গর্ভধারিণী মা হাইকোর্টে হেবিয়াস করপাস রিট আবেদন করলে আদালত প্রাথমিকভাবে রুল জারি করেছিলেন। রুলের শুনানিতে বিবাদী পক্ষ দাবি করে, হাসপাতালে প্রায় দুই মাস চিকিৎসা চলার পরও শিশুর বাবা-মায়ের সন্ধান না পেয়ে তাদের পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সমাজসেবা অধিদপ্তরে হস্তান্তর করা হয়েছিল এবং যুক্তরাজ্যপ্রবাসী দম্পতি আইন মেনেই আদালত থেকে ডিক্রি নিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করে, ভর্তির দিন রাতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে শিশুর বাবা আসার আশ্বাস দিয়েও পরে আর আসেননি।
নথিপত্র পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, সন্তানকে বাবা-মা স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করেছিলেন নাকি সংঘাত ও আর্থিক সংকটের চাপে সাময়িক বিচ্ছিন্ন হয়েছিলেন—এটি একটি জটিল ও বিতর্কিত ঘটনাগত প্রশ্ন। আদালত বলেন, রিট এখতিয়ারের সংক্ষিপ্ত কার্যধারায় এ জাতীয় তথ্যগত সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া পারিবারিক আদালত আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ডিক্রির বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে নিয়মিত আপিল করার আইনি ফোরাম রয়েছে। ফলে বিশেষায়িত আইন থাকা অবস্থায় রিট আবেদনটি খারিজ ঘোষণা করে আদালত এর আগের অন্তর্বর্তী আদেশ বাতিল করেন। তবে সন্তান ফিরে পেতে গর্ভধারিণী মা উপযুক্ত পারিবারিক বা দেওয়ানি আদালতে আইনি প্রতিকার চাওয়ার সম্পূর্ণ অধিকার রাখবেন বলে রায়ে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন হাইকোর্ট।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন