মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার কারণ ও মানসিক অবসাদের সমাধান

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১২:২০ পিএম

সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগার কারণ ও মানসিক অবসাদের সমাধান

কর্মক্ষেত্র কিংবা ব্যক্তিগত পরিসরে মানুষকে প্রতিদিন প্রতিনিয়ত অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। জীবনের একটি অপরিহার্য ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের চাপ মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ক্রমাগত পছন্দের মুখে পড়তে পড়তে মস্তিষ্ক একসময় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তি বা ডিসিশন ফ্যাটিগ বলা হয়। মূলত সারাদিন ধরে অগুনতি সিদ্ধান্ত নিতে থাকলে মানুষের ভেতরে যে মানসিক অবসাদ তৈরি হয়, তা মনোযোগ ও বিচারক্ষমতাকে স্থবির করে দেয়।

মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পুরোপুরি শেষ না হলেও এই অবস্থায় স্থির থাকা কঠিন হয়। সিদ্ধান্তজনিত ক্লান্তির সাতটি প্রধান লক্ষণ দৈনন্দিন আচরণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যন্ত সাধারণ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েও হিমশিম খাওয়া, যেকোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময় ব্যয় করা এবং দায়িত্ব এড়াতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পুরোপুরি এড়িয়ে চলা। এ ছাড়া সার্বক্ষণিক বিরক্ত বা অধৈর্য বোধ করা, নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে না পেরে বারবার পরিবর্তন করা এবং শুধু পরিস্থিতি পার করতে সবচেয়ে সহজ বা অনিরাপদ বিকল্পটি বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। একই সঙ্গে একাধিক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হওয়ার পর তীব্র মানসিক ক্লান্তি অনুভূত হওয়া এই মানসিক অবস্থার অন্যতম প্রকাশ।

দৈনন্দিন জীবনের বহুমুখী চাপ ও অস্থির পরিবেশ এই ক্লান্তির প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। ব্যস্ত কর্মদিবস, অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব এবং ডিজিটাল পর্দার অবিরাম নোটিফিকেশন মানুষকে মানসিক চাপে ফেলে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, সামনে অনেক বেশি বিকল্পের উপস্থিতি এবং প্রতিটি বিষয়ে নিখুঁত হওয়ার তীব্র চেষ্টা ডিসিশন ফ্যাটিগ বাড়িয়ে দেয়। পর্যাপ্ত বিরতি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত নির্ধারণ এবং মেসেজ, ইমেইল ও অন্যান্য কাজের মধ্যে ঘনঘন মনোযোগ পরিবর্তনের কারণেও মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

জার্নাল অব হেলথ সাইকোলজিতে প্রকাশিত ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে হাজার হাজার সিদ্ধান্ত নেন। গবেষকরা জানান, ভারী শরীরচর্চার পর শারীরিক পেশি যেমন ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তেমনি অবিরাম ব্যবহারে মস্তিষ্কও সাময়িকভাবে পূর্ণ কর্মক্ষমতা হারায়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, মানুষ যখন এই ক্লান্তিতে ভোগে, তখন হয় তারা চরম হঠকারী পদক্ষেপ নেয় অথবা সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। চিকিৎসাসেবা প্রদানকারীদের ওপর এই অবস্থার প্রভাব নিয়ে গবেষকরা বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন। সারাদিন রোগীদের জন্য জটিল সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে চিকিৎসকেরা যখন ক্লান্ত হন, তখন তারা যথাযথ পদ্ধতি বাদ দিয়ে দুর্বল সিদ্ধান্ত বা ঝুঁকিপূর্ণ শর্টকাটের ওপর নির্ভর করতে পারেন। একইভাবে দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রতিদিনের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের চাপে ভেঙে পড়ে নিজেদের নিয়মিত পরিচর্যা বন্ধ করে দিতে পারেন।

এই মানসিক অবসাদ কাটিয়ে ওঠার জন্য দৈনন্দিন আচরণে সচেতন পরিবর্তন আনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। দিনের যে অংশে মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সজাগ ও কার্যকর থাকে, তখন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা উচিত। খাবার বা পোশাক নির্বাচনের মতো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের জন্য নির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করলে মস্তিষ্ক চাপমুক্ত থাকে। একটি সংক্ষিপ্ত কাজের তালিকা রাখা, অপ্রয়োজনীয় দায়িত্ব সীমিত করা, কাজের ফাঁকে নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি। কাজের সময় মুঠোফোন দূরে রাখা এবং প্রতিটি সিদ্ধান্ত শতভাগ নিখুঁত হওয়ার অবাস্তব চাপ পরিহার করে তা গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সম্পন্ন করাই মানসিক ভারসাম্য রক্ষার মূল উপায়। তবে মানসিক ক্লান্তি বা মনোযোগের অভাব দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিলে পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, কারণ বিষণ্ণতা বা ঘুমের সমস্যা থেকেও এ ধরনের উপসর্গ তৈরি হতে পারে।