সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
স্বাস্থ্যকর ওজন নিয়ন্ত্রণ

ওজন কমাতে ভাত-রুটি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১০:৫২ এএম

ওজন কমাতে ভাত-রুটি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই

ওজন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়ার সময় অনেকেই খাদ্যতালিকা থেকে প্রথমেই ভাত ও রুটি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সাধারণ একটি ধারণা রয়েছে যে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার পরিহার করলেই দ্রুত শরীরের মেদ গলে যাবে। তবে পুষ্টিবিজ্ঞান অনুযায়ী বিষয়টি এত সরল নয়। ওজন কমাতে গিয়ে শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বর্জন করার চেয়ে কোন ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে, কী পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে এবং খাবারের পাতে অন্যান্য কী উপাদান থাকছে, সেটি নির্ধারণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কার্বোহাইড্রেট মূলত মানবদেহের প্রধান শক্তি সরবরাহের উৎস হিসেবে কাজ করে। খাবার থেকে গ্রহণ করা শর্করা ভেঙে শরীরে গ্লুকোজ তৈরি হয়, যা প্রতিটি কোষ ও অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে শক্তি জোগায়। এমনকি মস্তিষ্কও তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে গ্লুকোজকে প্রধান জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

হঠাৎ করে খাদ্যতালিকা থেকে শর্করা সম্পূর্ণ বাদ দিলে একেক জনের শরীরে একেক ধরনের প্রভাব পড়ে। খাবারের মোট ক্যালরি কমে যাওয়ার কারণে কারও ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় ওজন কমতে পারে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে অতিমাত্রায় কম কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলে শরীরে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের গুরুতর ঘাটতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ওজন কমার মূল বিজ্ঞান নির্ভর করে ক্যালরির ভারসাম্যের ওপর। সারাদিনে শরীর যে পরিমাণ ক্যালরি খরচ করছে, তার তুলনায় খাবার থেকে কতটা ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করছে—সেটিই মূল বিষয়। ফলে নিয়মিত ভাত বা রুটি খেয়েও শরীরের ওজন কমানো সম্ভব, যদি পুরো খাদ্যতালিকা সুষম থাকে এবং প্রয়োজনীয় ক্যালরি সুনির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

শর্করা জাতীয় খাবার হঠাৎ খুব কমিয়ে দিলে শুরুতে ওজন কিছুটা দ্রুত কমতে দেখা যায়। এর মূল কারণ হচ্ছে মানবদেহে জমে থাকা গ্লাইকোজেনের সঙ্গে সঞ্চিত পানি শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া। অতিমাত্রায় কম কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করলে শরীর শক্তির বিকল্প উৎস হিসেবে ফ্যাট ভেঙে কিটোন তৈরি করতে শুরু করে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে কিটোসিস নামে পরিচিত। তবে শর্করা কম খেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিটোসিস ঘটবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, আর ওজন কমানোর জন্য প্রত্যেকের কিটো ডায়েট অনুসরণের কোনো আবশ্যকতাও নেই।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কম প্রক্রিয়াজাত এবং আঁশযুক্ত বা ফাইবারসমৃদ্ধ কার্বোহাইড্রেটকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। খাদ্যতালিকায় ওটস, ডালিয়া, বাদামি চাল বা ব্রাউন রাইস, লাল আটা বা পূর্ণ শস্যের রুটি, ডাল, বিভিন্ন মিলেট এবং পরিমিত পরিমাণে আলু বা অন্যান্য মৌসুমি শাকসবজি রাখা যেতে পারে।

উচ্চ আঁশযুক্ত খাবার তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে। এর ফলে কারণে-অকারণে বারবার খাবার গ্রহণের প্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। তবে কোনো খাবারের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম হলেই তা সীমাহীন পরিমাণে খাওয়া যাবে—এমনটি ভাবা সম্পূর্ণ ভুল। খাবারের সঠিক পরিমাণ এবং সামগ্রিক পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখাই আসল কাজ।

বাঙালির নিয়মিত খাদ্যতালিকায় ভাত অবশ্যই রাখা সম্ভব। তবে মনোযোগ দিতে হবে খাওয়ার পরিমাণের ওপর। এক প্লেট ভাতের সঙ্গে শুধু আলুভর্তা বা ভাজাপোড়া না রেখে সেখানে মাছ, ডিম, মুরগির মাংস, ডাল বা অন্য যেকোনো প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ তাজা শাকসবজি যুক্ত করতে হবে। রুটির ক্ষেত্রে সাদা ময়দা এড়িয়ে পূর্ণ শস্যের আটার রুটি বেছে নেওয়া বেশি উপকারী।

খাদ্যতালিকা থেকে কিছু কমাতে চাইলে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত মিষ্টি খাবার, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবার এবং পরিশোধিত ময়দার তৈরি সামগ্রী বর্জন করা সবচেয়ে বেশি যুক্তিসঙ্গত। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ওজন নিয়ন্ত্রণে কার্বোহাইড্রেটকে শত্রু না ভেবে সঠিক পরিমাণে খাওয়া, প্রোটিন ও ফাইবারের সঙ্গে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা অব্যাহত রাখাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।