সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
দৈনন্দিন জীবনের নানা টানাপোড়েন ও ব্যস্ততায় মানুষের মানসিক মেজাজ বা আবেগের দ্রুত পরিবর্তন একটি অতি পরিচিত সমস্যা। মনকে নিমিষেই চাঙ্গা করা, মানসিক চাপ দূর করা এবং কাজে মনোযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় কোনো সময়সাপেক্ষ যোগব্যায়াম ছাড়াও মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কিছু অতি ক্ষুদ্র অভ্যাস বা মাইক্রোপ্র্যাকটিস জাদুকরী ভূমিকা রাখতে পারে বলে আধুনিক গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে। ক্ষুদ্র অনুশীলন বিষয়ক গবেষক এলি সাসম্যানের মতে, কোনো দীর্ঘ আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছাড়াই মাত্র ৩০ সেকেন্ড ব্যয় করে শরীর ও মনের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
হাস্যরস ও কৌতুক ছাড়া কেবল ইচ্ছাকৃত হাসির মাধ্যমেই মন সতেজ করার কৌশল হিসেবে কাজ করে লাফটার ইয়োগা। মনোবিজ্ঞানী ন্যাটালি ভ্যান ডের ওয়ালের গবেষণা অনুযায়ী, কোনো বাহ্যিক রসিকতা ছাড়াই স্বেচ্ছায় হাসার অনুশীলন মানুষের বিষণ্ণতা কাটিয়ে সামাজিক যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। এই অনুশীলনের সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে তিনবার বুক ভরে গভীর শ্বাস গ্রহণ করতে হয়। এরপর কৃত্রিমভাবে হলেও মৃদু স্বরে হাসির ধ্বনি সৃষ্টি করতে হবে এবং ধীরে ধীরে সেই শব্দের মাত্রা বাড়াতে হবে। কৃত্রিম হাসিটি কিছুক্ষণ পরেই অবচেতনভাবে স্বাভাবিক হাসিতে রূপ নেয়, যা সম্পন্ন করার পর পুনরায় একটি দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে নিজের জীবনের যেকোনো ইতিবাচক বা কৃতজ্ঞতাবোধের কথা স্মরণ করতে হয়।
টানা বসে কাজ করার শারীরিক ক্লান্তি দূর করতে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মাইক্রো ইয়োগা বা শরীর টানটান করার স্ট্রেচিং দারুণ কার্যকরী। একটানা কম্পিউটার বা মুঠোফোনের স্ক্রিনের সামনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে মাংসপেশিতে তীব্র টান বা অসাড়তা তৈরি হয়। এই শারীরিক জড়তা কাটাতে প্রতি ১৫ মিনিট পর পর পিঠের পেছনে দুই হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে জড়িয়ে নিয়ে শ্বাস গ্রহণের সাথে সাথে হাত নিচের দিকে প্রসারিত করে বুক সামান্য ওপরের দিকে তুলতে হবে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে শ্বাস ছাড়ার মাধ্যমে পুরো শরীরকে সম্পূর্ণভাবে শিথিল করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়।
তীব্র উদ্বেগ বা চাপের মুখে মস্তিষ্ককে শান্ত করার সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক ও তাৎক্ষণিক উপায় হলো ধীরগতির শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন। ইতালির ইউনিভার্সিটি অব নেপলস ফেদেরিকো টু-এর গবেষক অমিত কুমারের নেতৃত্বাধীন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র তিনটি ধীর ও প্রলম্বিত শ্বাস গ্রহণ করলে মানব মস্তিষ্কে শান্তভাব ও মনোযোগের সাথে যুক্ত আলফা তরঙ্গের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। একই সাথে এটি গভীর মানসিক শিথিলতার সূচক থিটা তরঙ্গকেও উদ্দীপিত করে। অফিসে গুরুত্বপূর্ণ কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠকের পূর্বে বা উদ্বেগ বাড়লে প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিয়ে একেকটি দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণ করতে হয়, যেখানে শ্বাস গ্রহণের চেয়ে শ্বাস ত্যাগের সময়সীমাটি কিছুটা দীর্ঘ রাখা জরুরি।
স্পর্শের মাধ্যমে নিজেকে শান্ত করার বৈজ্ঞানিক উপায় হিসেবে আত্ম-সহানুভূতিশীল স্পর্শের কার্যকারিতা তুলে ধরেছেন মনোবিজ্ঞানীরা। গবেষক সাসম্যানের তথ্যমতে, মাত্র ২০ সেকেন্ড সময় নিয়ে নিজের শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে নিজেকে শান্ত করার স্পর্শ প্রদানের অভ্যাস ব্যক্তিগত অস্থিরতা কমাতে সহায়ক হয়। দীর্ঘমেয়াদি এক ফলো-আপ গবেষণায় দেখা গেছে যে নিয়মিত বিরতিতে এই স্পর্শের পুনরাবৃত্তি ঘটালে পরবর্তী ছয় মাসে ব্যক্তির নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব ও মানসিক দৃঢ়তা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবকটি কৌশল একসাথে অনুসরণের প্রয়োজন নেই, বরং ব্যক্তিগত দৈনন্দিন রুটিনের সাথে যেটি সবচেয়ে মানানসই কেবল সেই ক্ষুদ্র অভ্যাসটি বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন