রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
ঐতিহ্যের অবক্ষয় ও অপরাধ

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক ও অপরাধে নিরাপত্তাহীনতা

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদক ও অপরাধে নিরাপত্তাহীনতা

সন্ধ্যা নামতেই রাজধানীর শাহবাগের ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে ভূতুড়ে অন্ধকার নেমে আসে। হাঁটার পথের দুই পাশে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ আর বর্জ্যের দুর্গন্ধে একসময়ের পরিচ্ছন্ন সবুজ চত্বরটি এখন নগরবাসীর জন্য চরম আতঙ্কের স্থানে রূপ নিয়েছে। পর্যাপ্ত আলোর অভাবে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সাধারণ দর্শনার্থীরা সন্ধ্যার আগেই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন।

ঐতিহাসিক উদ্যানটির নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই মাদক ও ছিনতাইকারী চক্রের কবলে চলে যাচ্ছে। একসময় রমনা রেসকোর্স ময়দান নামে পরিচিত এই উদ্যানেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে এর নাম পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান রাখা হয় এবং নগরবাসীর নির্মল অবকাশের কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনের বেলায় বিভিন্ন গাছের নিচে ও বসার স্থানে ভবঘুরেদের আড্ডা থাকে এবং সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে যোগ দেয় মাদকসেবীরা। বসার কংক্রিটের স্থানগুলোতে প্লাস্টিকের বস্তা ও আবর্জনা জমে থাকায় হাঁটাচলাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিয়মিত প্রাতঃভ্রমণে আসা আজিমপুরের বাসিন্দা ওমর আলী জানান, মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের অবাধ আনাগোনার কারণে তিনি এখন ভয়ে উদ্যানে আসা বন্ধ করে দিয়েছেন। হাতিরপুলের বাসিন্দা আজিজুর রহমান খান অভিযোগ করেন, উদ্যানে হাঁটার সময় দুর্গন্ধের কারণে নাকে রুমাল চেপে চলতে হয় এবং যেখানে-সেখানে মলমূত্র ত্যাগকারী ভবঘুরেদের কিছু বলতে গেলে তারা দলবেঁধে হামলার চেষ্টা চালায়।

উদ্যানে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক কেনাবেচা ও সেবনের ঘটনা ঘটছে। সন্ধ্যার দিকে মোটরসাইকেলে এসেও ক্রেতারা মাদক সংগ্রহ করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রেতা দাবি করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও পরবর্তীতে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যায়।

তবে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, গত সাত মাসে প্রায় এক হাজার ৭০০ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং পুলিশের নজরদারি ফাঁকি দিয়ে যারা মাদক বিক্রির চেষ্টা করে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

উদ্যানের নিরাপত্তায় সাতটি প্রবেশপথে পালাক্রমে সার্বক্ষণিক ৪০ জন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু তাদের সামনেই অপরাধীরা সক্রিয় থাকছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আনসার সদস্য দাবি করেন, পারুল নামের এক নারীকে তারা মাদক চক্রের মূলহোতা হিসেবে চেনেন। আনসার সদস্যদের পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা না থাকা এবং মাদকসেবীদের কাছে ধারালো ছুরি ও লাঠি থাকায় অনেক সময় ব্যবস্থা নিতে গেলে তারা হামলার মুখে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

নিরাপত্তার এই ঘাটতির সুযোগে দর্শনার্থীদের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনতাইয়ের অভিযোগ বাড়ছে। মিরপুর থেকে পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থী বিপুল শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পুরো উদ্যানে সিগারেট আর গাঁজার ধোঁয়ার কারণে পরিবার নিয়ে বসার কোনো পরিবেশ নেই। এর আগে গত বছরের ১৩ মে রাতে মাদক বিক্রিতে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে উদ্যানের ভেতরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা এস এম শাহরিয়ার আলম। সেই হত্যাকাণ্ডের পরও পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান হয়নি।

উদ্যানের সৌন্দর্যবর্ধনে ২০২০ সালে খাবারের রেস্তোরাঁর জন্য নির্মিত সাতটি অবকাঠামো মামলার কারণে চালু হতে পারেনি। ফলে সেগুলোতে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেছে ভবঘুরেরা। প্রায় ৬৮ একরের বিশাল এই উদ্যানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছেন মাত্র সাতজন, নেই কোনো মালি। ফলে স্বাধীনতা স্তম্ভের মতো জাতীয় স্মৃতিবিজড়িত চত্বরেও হকারদের জবরদখল ও উপদ্রব দেখা যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর থেকে উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরটি এখনও বন্ধ রয়েছে।

উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৬৩ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া তৃতীয় পর্যায়ের কাজে ৩৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চলমান উন্নয়ন কাজের জন্য বরাদ্দ থাকলেও উদ্যানের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা কোনো তহবিল নেই। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও সাধারণ নগরবাসী কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।