অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের নোয়াখালীতে তার ঐতিহাসিক পদযাত্রা। ১৯৪৬ সালের নভেম্বরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতবিক্ষত নোয়াখালীতে তিনি যখন পৌঁছান, তখন তার বয়স ছিল ৭৭ বছর। ৬ নভেম্বর নোয়াখালীর উদ্দেশে যাত্রা করে পরদিন ৭ নভেম্বর চৌমুহনী পৌঁছান তিনি। এরপর উপদ্রুত বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে মানুষের দুর্দশা ও সহিংসতার রূপ প্রত্যক্ষ করেন। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন রাজনৈতিক সভার চেয়ে সরাসরি বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোকেই প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনি।
সত্য, অহিংসা ও স্বরাজ ছিল গান্ধীর রাজনৈতিক চিন্তার মূল ভিত্তি। স্বরাজ বলতে তিনি কেবলমাত্র ব্রিটিশ শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান বোঝেননি; মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষা, নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এবং স্থানীয় সমাজের অংশীদারত্বকে তিনি এর কেন্দ্রে রেখেছিলেন। গ্রাম স্বরাজের ধারণায় স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এই রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তব প্রয়োগ দেখা গিয়েছিল নোয়াখালী সফরের সময়।
বাংলার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার জন্য বিশেষ যাত্রাব্যবস্থা বরাদ্দ করলেও গান্ধী তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, এ ধরনের বিশেষ সুবিধা কেবল বড় মানুষদের জন্য প্রযোজ্য। গোয়ালন্দে তিনি জানিয়েছিলেন, দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা দেওয়া এবং নিপীড়িত মানুষের চোখের জল মোছানোই তার সফরের একমাত্র লক্ষ্য। ১৩ নভেম্বর তিনি সফরসঙ্গীদের আক্রান্ত গ্রামগুলোতে অবস্থান করার আহ্বান জানান এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার স্বার্থে নিজেদের এক ধরনের জিম্মি হিসেবে রাখার কথা বলেন। ১৯৪৭ সালের ২ জানুয়ারি চন্দীপুরে তিনি নোয়াখালীর মাটিতে জুতা ছাড়া হাঁটার সিদ্ধান্ত নেন এবং পরবর্তীতে নোয়াখালী ও তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার বিভিন্ন গ্রামে খালি পায়ে পদযাত্রা করেন।
অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে গান্ধীর অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ বজায় ছিল। ওই সময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও গান্ধী আলোচনার পথ বন্ধ করেননি। মতপার্থক্যের মধ্যেও প্রতিপক্ষের সাথে সংলাপ চালু রাখাই ছিল তার রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। ১৯৪৭ সালের আগস্টে কলকাতায় পুনরায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে তিনি নোয়াখালী যাত্রা স্থগিত করে কলকাতার বেলেঘাটার হায়দারি মঞ্জিলে ১৩ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অবস্থান করেন। ৩১ আগস্ট সেখানে সংঘাত তীব্র হলে ১ সেপ্টেম্বর তিনি অনশন শুরু করেন এবং ৭৩ ঘণ্টা পর ৪ সেপ্টেম্বর অনশন ভাঙেন। সেদিন রাতেই বহু মানুষ অস্ত্র সমর্পণ করে সংঘাত বন্ধের অঙ্গীকার করে।
ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো সমকালীন প্রেক্ষাপটেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে সমাজে গণপিটুনি, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর আঘাত, ভিন্নমতের প্রতি চরম অসহিষ্ণুতা এবং পারিবারিক নির্যাতনকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের নারীর ওপর সহিংসতা জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরন বিবেচনায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
জরিপের আগের ১২ মাসে এই হার ছিল ৪৯ শতাংশ। এছাড়া স্বামীর শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের ৬৪ শতাংশই ঘটনাটি কখনো কাউকে জানাননি।
বহু-সূচক গুচ্ছ জরিপের ২০২৫ সালের তথ্যে দেখা গেছে, এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ জরিপের পূর্ববর্তী এক মাসে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের মাধ্যমে শারীরিক শাস্তি কিংবা মানসিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান মহাত্মা গান্ধী। ২০২৬ সালের ২ অক্টোবর তার ১৫৭তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে। নোয়াখালী সফর হয়তো দেশভাগ ঠেকাতে পারেনি, কিন্তু সহিংসতার সময় নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান না করে সরাসরি দুর্গত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর নৈতিক অবস্থান আজও মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা এবং সহনশীলতার প্রশ্নে প্রাসঙ্গিক হয়ে রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন