রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
গ্রামবাংলার বৈচিত্র্যময় জীবনধারা

নওপা গ্রামে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনের চালচিত্র

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ১২:০৪ পিএম

নওপা গ্রামে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবনের চালচিত্র

সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের একটি চিরসবুজ গ্রামীণ জনপদ নওপা গ্রাম। সেখানে বাঙালিদের পাশাপাশি দীর্ঘকাল ধরে পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে গড়ে ওঠা এই পল্লিতে কাকডাকা ভোরেই শুরু হয় দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা। ভোরে গৃহস্থালির কাজের পাশাপাশি রান্না সেরে নেন নারীরা। নারী ও পুরুষ উভয়ই সকাল থেকে সমান তালে কায়িক শ্রমে যুক্ত হন। সাঁওতালদের আদি ধর্মীয় বিশ্বাসে প্রধান উপাস্য সূর্য হলেও নওপা গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে সনাতন হিন্দু ধর্মীয় আচার পালনের ব্যাপক প্রভাব দেখা যায়। গৃহিণীরা সকালে উঠানের তুলসী দেবীর আরাধনা করে দিনের সূচনা করেন। রান্নাবান্নার কাজে জ্বালানি হিসেবে রোদে শুকানো কাঠের ব্যাপক কদর রয়েছে। এছাড়া গোবরের তৈরি চাপড়া বা ঘুটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কাঁচা গোবর গোলাকার বা চ্যাপ্টা পিণ্ড আকারে গাছ অথবা মাটির দেওয়ালে সেঁটে রোদে শুকিয়ে মজুত করা হয়।

কৃষিভিত্তিক পরিবারগুলোতে গৃহপালিত পশুপালনের প্রতি গভীর ভালোবাসা লক্ষ্য করা যায়। তারা প্রতিটি গবাদি পশুকে পরিবারের আপন সদস্যের মতো পরম মমতায় লালন করেন।

সাঁওতালদের চিরায়ত খাদ্যাভ্যাসে রয়েছে স্বতন্ত্র বৈচিত্র্য। প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় তাদের অন্যতম প্রিয় ও উপাদেয় উপাদান হলো গেরি, গুগলি বা শামুক। বিভিন্ন জলাশয় ও খালবিল থেকে সংগ্রহ করা শামুক প্রক্রিয়াজাত করে রান্না করা হয়। গরম পানিতে সেদ্ধ করে খোলস থেকে নরম অংশ বের করার পর লবণ দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে ধোয়া হয়, যাতে পিচ্ছিল ভাব ও তীব্র আঁশটে গন্ধ দূর হয়। এরপর কড়াইয়ে খাঁটি সরিষার তেলে পেঁয়াজ কুচি ও অন্যান্য মশলার সঙ্গে কষানো হয়। এই রান্নার একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলো ভাজা চালের গুঁড়া। চাল ভেজে বেটে ঝোলে মিশিয়ে দিলে তরকারিতে চমৎকার সুঘ্রাণ তৈরি হয় এবং ঝোল ঘন হয়। স্বাদ ও সুবাস বাড়াতে এতে দুটি কাগজিলেবুর পাতাও যুক্ত করা হয়। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, গুগলি শামুকে উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম ও কম সোডিয়াম থাকায় রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে এবং হৃদরোগ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি কমে। পাশাপাশি এতে ভিটামিন এ, ফ্যাটি এসিড, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, জিংক ও আয়রনের মতো দরকারি উপাদান রয়েছে।

সংসার পরিচালনায় সাঁওতাল নারীরা অত্যন্ত নিপুণ ও পরিশ্রমী। নিজেদের মাটির তৈরি ঘরবাড়ি নিয়মিত মাটির প্রলেপ দিয়ে চকচকে করে রাখেন তারা। ঘরের ভেতরের দেওয়ালে মসৃণ প্রলেপের পাশাপাশি বাইরের দিকে নানা নকশা ও আল্পনা এঁকে গৃহকোণকে নান্দনিক রূপ দেওয়া হয়। গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে খেজুরের পাতা কেটে শুকিয়ে বুনন করা হয় টেকসই পাটি বা চাটাই। আবার শীতের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন নকশায় সুঁই-সুতো দিয়ে কাঁথা সেলাইয়ের কাজেও নারীদের পারদর্শিতা লক্ষণীয়।

পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোয় পরিচালিত সাঁওতাল পরিবারে পৈতৃক সম্পত্তিতে কেবল ছেলেদের অধিকার নিশ্চিত থাকে। স্বাভাবিক নিয়মে মেয়েরা কোনো সম্পত্তির অংশীদার হন না, তবে পিতা স্বেচ্ছায় দান করলে তা ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য হয়।

কৃষি উৎপাদনে চাল প্রক্রিয়াকরণের পুরোনো ধারা এখনো তাদের জীবনে বেঁচে রয়েছে। সেদ্ধ ধান রোদে শুকানোর পর কুলা দিয়ে ঝেড়ে পরিষ্কার করা হয়। একসময় ঢেঁকির মাধ্যমে চাল তৈরির চল ঘরে ঘরে থাকলেও বর্তমানে যন্ত্রের প্রভাব বেড়েছে। তবু গ্রামীণ গৃহস্থালিতে কুলায় চাল ঝাড়ার আবহমান দৃশ্য এখনো বহাল।

ঐতিহাসিক বিশ্বাস অনুসারে, সাঁওতালরা নিজেদের আদি মানব ও মানবী ‘পিলচু হারাম’ এবং ‘পিলচু বুড়ি’র সাত জোড়া সন্তানের বংশধর বলে মনে করে। এদের আদি সাতটি গোত্র ছিল, যা পরবর্তীতে সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে বারোটি প্রধান গোত্রে রূপ নিয়েছে। সাঁওতালি ভাষায় গোত্রকে ‘পারিস’ বলা হয়। প্রচলিত বারোটি গোত্র হলো—হাসদা, সরেন, টুডু, কিসকু, মুরমু, মান্ডি, বাস্কে, বেসরা, হেম্বরম, পাউড়িয়া, চড়ে ও বেদেয়া। তারা নিজস্ব সাঁওতালি ভাষায় কথা বললেও বর্তমান প্রজন্মের সন্তানদের দেশের মূলধারার প্রচলিত বাংলা শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন।

কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ও ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাচীন ধারক হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে সাঁওতালদের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। সিরাজগঞ্জ ছাড়াও দেশের উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বাস রয়েছে।

মাঠের কর্মযজ্ঞে পুরুষরা যেমন জমি চাষ করায় দক্ষ, তেমনি নারীরা বীজ বোনা, আগাছা দমন ও ফসল তোলায় সমান পারদর্শী। নিজস্ব আবাদি জমি না থাকায় নওপা গ্রামের অনেক সাঁওতাল অন্যের জমিতে দিনমজুর বা কৃষি শ্রমিক হিসেবে শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। রোপা আমন ধানের ক্ষেতে আগাছা পরিষ্কারের পাশাপাশি বর্ষার পাট পচানোর পর ডোবা-নালা থেকে আঁশ ছাড়ানোর কঠিন কাজগুলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে হাসিমুখে সম্পন্ন করেন। এছাড়া অর্থকরী ফসল হিসেবে চাষ হওয়া কচুরমুখী জমি থেকে তুলে নেটের ব্যাগে ঘষে মাটি পরিষ্কার করে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রির উপযোগী করা হয়।

কঠোর শ্রমের মধ্যেও গ্রামীণ আবহে নির্মল আনন্দের সুযোগ খুঁজে নেন বাসিন্দারা। অলস বিকেলে পাড়ার গৃহবধূ ও কিশোরীরা মেতে ওঠেন ঐতিহ্যবাহী দেশীয় খেলাধুলায়।

ঋতুভিত্তিক সুস্বাদু খাবারের ঐতিহ্যও এখানে অটুট। ভাদ্র ও আশ্বিনের শুরুতে পাকা তালের মৌসুমে তৈরি হয় সুস্বাদু তালের পিঠা বা বড়া। পাকা তাল ঘষে ঘন নির্যাস বের করে ছাঁকনি দিয়ে আঁশ আলাদা করা হয়। এরপর সেই নির্যাসের সাথে আতপ চালের গুঁড়া, আখের গুড় ও সামান্য লবণ মেখে ঘন মিশ্রণ তৈরি করে ডুবোতেলে ভাজা হয় তালের বড়া। ভাত তাদের প্রধান খাদ্য হলেও নিয়মিত আহারের তালিকায় মাছ, কাঁকড়া, শামুক, শুয়োর, হাঁস, মুরগি ও খরগোশের মাংস অত্যন্ত জনপ্রিয়।

কৃষিজীবী সাঁওতাল সমাজে বছরজুড়ে রয়েছে উৎসব-পার্বণের সমারোহ। তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ‘জাহেরথান’। উঠানে বা জাহেরথানে মাদল ও ঢোলের তালে তালে হাত ধরাধরি করে সাঁওতাল তরুণীরা নিজস্ব ভাষায় গান গেয়ে দলবদ্ধ নৃত্য পরিবেশন করেন। লোকবাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ‘তমক’ নামের বিশেষ নকশার মাদোল এবং ‘তুনতাক’ নামের ঐতিহ্যবাহী ঢোল ছাড়াও দোতারা, মন্দিরা ও বাঁশির সমন্বয় দেখা যায়। সাঁওতালি ভাষায় ‘বাহা’ শব্দের অর্থ ফুল। বসন্ত বরণের জন্য তারা আয়োজন করে বিখ্যাত ‘বাহা পরব’, যেখানে মেয়েরা খোঁপায় বুনো ফুল গুঁজে নাচ-গানে শামিল হয়ে আবহমান লোকজ ঐতিহ্যের সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেন।