সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

আবাসন ঋণ পাবে ৬০ হাজার পরিবার

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১০:৫৯ এএম

আবাসন ঋণ পাবে ৬০ হাজার পরিবার

বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ৬০ হাজার পরিবারকে বাড়ি নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও মেরামতের জন্য ঋণ দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রস্তাবিত ইনক্লুসিভ অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং ফাইন্যান্স প্রজেক্টের আওতায় এ অর্থায়ন করা হবে। এই প্রকল্পে সংস্থাটি ১০ কোটি মার্কিন ডলার বা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় এক হাজার ২২৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা ঋণ প্রদান করবে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) তাদের প্রায় ৪০টি অংশীদার ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই অর্থ মাঠপর্যায়ে যোগ্য পরিবারগুলোর মাঝে বিতরণ করবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পটির বিষয়ে এডিবি ইতোমধ্যে তাদের আনুষ্ঠানিক তথ্য-অনুসন্ধান মিশন শেষ করেছে। এখন প্রস্তাবটি সংস্থাটির পরিচালনা পর্ষদের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পের নথি অনুসারে, একজন ঋণগ্রহীতা গড়ে দুই লাখ টাকা করে পাবেন এবং সর্বোচ্চ ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত। ঋণ পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় দেওয়া হবে। মাসিক ৩০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা পরিবারগুলো এই ঋণের আবেদন করার যোগ্য হবেন। পরিবারের অর্থনৈতিক চাপ সহনীয় রাখতে ঋণের মাসিক কিস্তি মোট মাসিক আয়ের ৩০ শতাংশের নিচে রাখার শর্ত রাখা হয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত এই তহবিলের সুদের হার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়নি। পিকেএসএফের জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক এ কে এম নূরুজ্জামান জানান, সরকার থেকে পিকেএসএফ, পিকেএসএফ থেকে মধ্যবর্তী অংশীদার প্রতিষ্ঠান এবং অংশীদার প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণ ঋণগ্রহীতাদের পর্যায়ে সুদের হার কী হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের আগে সরকারের অর্থ বিভাগের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে এই হার নির্ধারণ করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এডিবির অর্থায়নে প্রাপ্ত তহবিল কী ব্যয়ে পিকেএসএফের হাতে আসছে, তার ওপরই গ্রাহক পর্যায়ের চূড়ান্ত সুদের হার নির্ভর করবে।

নতুন তহবিল পিকেএসএফ কম সুদে পেলে বিদ্যমান আবাসন ঋণ কর্মসূচির তুলনায় গ্রাহকদের আরও কম খরচে ঋণ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৯ সালে আবাসন নামে একটি পৃথক কর্মসূচি চালু করেছিল। সেই উদ্যোগের আওতায় বাড়ি নির্মাণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণের জন্য এখন পর্যন্ত ৫১ হাজার ২৪৬ জন সুবিধাভোগীকে মোট এক হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান কর্মসূচিতে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো পিকেএসএফ থেকে চার শতাংশ সুদে তহবিল পায় এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে বার্ষিক ১২ শতাংশ হারে সুদ আদায় করে। 

এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গোপন বা অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয় না। প্রস্তাবিত নতুন প্রকল্পে ঋণের মোট পরিমাণের ৮০ শতাংশই বিতরণ করা হবে কোনো ধরনের জামানত ছাড়া। তবে বাড়ি নির্মাণ, মেরামত বা সম্প্রসারণ ব্যয়ের বাকি একটি অংশ ঋণগ্রহীতাকে নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করতে হবে। এডিবির দেওয়া শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারীর বয়স হতে হবে ২১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। একই সঙ্গে নিজস্ব মালিকানায় বা বৈধ দখলে থাকা কমপক্ষে শূন্য দশমিক আট ডেসিমেল পরিমাণ বসতভিটার জমি থাকতে হবে। ঋণ আবেদনের জন্য কোনো ব্যাংক অথবা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক এবং আবেদনকারীর কোনো ঋণখেলাপির রেকর্ড থাকা চলবে না।

বিধবা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে এই ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে অগ্রাধিকার তালিকার সুবিধা পেতে হলেও কিস্তি পরিশোধের ন্যূনতম আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা হবে। সংস্থাটির নথিতে বাংলাদেশে সাশ্রয়ী আবাসন ও অর্থায়ন খাতের সংকটজনক চিত্রও উঠে এসেছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৬০ লাখ আবাসন ইউনিটের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।

২০৩০ সাল নাগাদ এই ঘাটতির আকার বেড়ে এক কোটি পাঁচ লাখ ইউনিটে পৌঁছাতে পারে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩১ হাজার ৫০০টি আবাসন ইউনিট নির্মিত হচ্ছে, যা বার্ষিক মোট চাহিদার মোটে এক শতাংশের কাছাকাছি। পাশাপাশি শহরাঞ্চলে প্রায় ১৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষ এখনও কোনোমতে বস্তিতে বসবাস করছেন।

এডিবির পর্যালোচনায় আরও বলা হয়েছে, দেশে বন্ধকভিত্তিক আবাসন ঋণের সুবিধা কেবল উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০২৩ অর্থবছরে দেশে মোট বন্ধকি ঋণের পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র এক দশমিক ৮৯ শতাংশ। আনুষ্ঠানিক জমির দলিলের অভাব, জামানত দিতে না পারা, দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সীমিত সুযোগ এবং সাশ্রয়ী ঋণপণ্যের অপ্রতুলতার কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো প্রাতিষ্ঠানিক আবাসন ঋণ থেকে বঞ্চিত থাকছে। প্রস্তাবিত দশ কোটি ডলারের এই আন্তর্জাতিক তহবিল পুরোপুরি ছাড় হলে পিকেএসএফের মাধ্যমে ৬০ হাজার পিছিয়ে পড়া পরিবার নিজেদের নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করার বাস্তব সুযোগ পাবে।