সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১১:৫০ এএম
শিশুর মানসিক ও সামাজিক বিকাশের প্রাথমিক পাঠ শুরু হয় পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষটির হাত ধরে। শৈশবের ছোট পৃথিবীতে মায়ের কণ্ঠস্বর, আদর, স্পর্শ এবং বিপদের মুহূর্তে সাড়া দেওয়ার ধরনই মূলত শিশুর কাছে তার নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ভয় পেলে মায়ের কাছে ছুটে যাওয়া, কান্নায় অস্থির হলে মায়ের সান্নিধ্যে শান্ত হওয়া কিংবা দৈনন্দিন আনন্দের কথা ভাগ করে নেওয়ার মুহূর্তগুলোর মধ্য দিয়েই শিশুর মনে চারপাশের মানুষ ও সম্পর্ক সম্পর্কে প্রাথমিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানের আলোচনায় এই বিশেষ মানসিক ও আবেগীয় বন্ধনকে বলা হয় সংযুক্তি। প্রয়োজনের সময়ে পরিচর্যাকারী কতটা সংবেদনশীল ও ইতিবাচকভাবে সাড়া দিচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এই সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। শিশুর শৈশবে নিরাপদ ও ধারাবাহিক মানসিক যত্ন নিশ্চিত করা গেলে তার ভেতরে তৈরি হয় নিরাপদ সংযুক্তি। এর ফলে শিশু আত্মবিশ্বাস অর্জন করে এবং বুঝতে শেখে যে প্রয়োজনে অন্যের সহায়তা গ্রহণ করা যায়, নিজের মানসিক অনুভূতি সুস্থভাবে প্রকাশ করা সম্ভব এবং আশেপাশের মানুষের ওপর আস্থা রাখা যায়। একই সাথে বিপদ কেটে গেলে নতুন উদ্যমে জগতকে অন্বেষণ করার সাহসও সে অর্জন করে।
এর বিপরীতে যদি শৈশবে শিশুর মৌলিক আবেগীয় চাহিদা বারবার অবহেলিত হয় কিংবা তাকে অনিয়মিত ও অনিরাপদ যত্নের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তবে তার আচরণে অনিরাপদ সংযুক্তির বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, শৈশবের এই জটিলতার অর্থ এই নয় যে মানুষের ভবিষ্যৎ অবধারিতভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। পরবর্তী জীবনের ইতিবাচক মানবিক সম্পর্ক, গঠনমূলক সামাজিক পরিমণ্ডল এবং আত্মউন্নয়নের সুযোগ মানুষের আচরণ ও সম্পর্কের ধারণায় উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
শৈশবের আশ্রয়ের অনুভূতি পরবর্তী জীবনে মানুষের বন্ধুত্ব, প্রেম ও দাম্পত্যের ক্ষেত্রে পারস্পরিক আস্থা ও নির্ভরতার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। বড় বয়সেও মানসিক চাপ বা সংকটের মুহূর্তে মানুষের মানসিক আশ্রয়ের প্রয়োজন পুরোপুরি ফুরিয়ে যায় না। শৈশবে অবহেলা বা প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হওয়া মানুষের মধ্যে বড় হয়ে অতিরিক্ত আশ্বাসের অন্বেষণ, বিচ্ছেদের তীব্র ভয় অথবা মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়া পুরোপুরি এড়িয়ে চলার নেতিবাচক প্রবণতা প্রকাশ পেতে পারে।
সন্তানের সঙ্গে নিরাপদ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য মাকে প্রতিটি কাজে নিখুঁত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। শিশুর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা, তার অনুভূতিকে অবমূল্যায়ন না করা এবং অসাবধানতাবশত কোনো ভুল হলে সম্পর্কের দূরত্ব ঘুচিয়ে নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। শিশু যখন কিছু বলতে চায়, তখন অন্য সব ব্যস্ততা সাময়িক বিরতি দিয়ে তার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। কোনো কারণে ব্যস্ততা থাকলে সরাসরি সময়সীমা নির্ধারণ করে জানিয়ে দেওয়া ভালো, যাতে শিশু সময়ের মূল্য এবং সীমানার গুরুত্ব অনুধাবন করতে শেখে।
একই সাথে সন্তানের নিজস্ব ব্যক্তিগত পরিসরকে মর্যাদা দিতে হবে এবং মায়ের নিজের বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় ও শখের জায়গাটুকুও সুরক্ষিত রাখা অপরিহার্য। প্রতিটি শিশুর মানসিক আগ্রহ ও সক্ষমতা একেবারেই স্বতন্ত্র হওয়ায় অন্য শিশুদের সাথে কোনো ধরনের নেতিবাচক তুলনা করা উচিত নয়। পড়াশোনা, চিত্রকলা, খেলাধুলা বা গল্প বলা—যে কোনো বিশেষ প্রতিভাকে ইতিবাচক স্বীকৃতি দিয়ে তার আত্মমর্যাদাবোধ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
মায়ের সঙ্গে সন্তানের কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য তৈরি হলে উত্তেজিত না হয়ে শান্তভাবে তার বক্তব্য শোনা জরুরি। সব সিদ্ধান্ত শিশুর ইচ্ছেমতো বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও তার যুক্তি প্রকাশ করার সুযোগ দেওয়া তাকে ভবিষ্যৎ জীবনে দায়িত্বশীল ও আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, মনোযোগ, ক্ষমা প্রার্থনা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়েই সন্তানের মনে এই স্থায়ী বিশ্বাস প্রোথিত হয় যে তার একটি পরম নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন