সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম
ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পর নিয়মিত চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ এবং নিবিড় শারীরিক যত্নের পাশাপাশি রোগীর জীবনযাপনের ধরন সামগ্রিক সুস্থতার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রাত্যহিক কিছু পরিচিত বদভ্যাস যে মানবদেহের স্বাভাবিক বিপাকীয় প্রক্রিয়া ব্যাহত করে এবং প্রদাহ বাড়িয়ে তোলে, তা অনেক সময়ই অসতর্কতায় নজর এড়িয়ে যায়। দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় বসে থাকা, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস কিংবা পর্যাপ্ত বিশ্রামের ঘাটতি নিয়ে জরুরি স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা দিয়েছেন ভারতের ছত্তিশগড়ের রায়পুরের জ্যেষ্ঠ ক্যানসার সার্জন চিকিৎসক জয়েশ শর্মা।
সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে এই বিশেষজ্ঞ এমন পাঁচটি ক্ষতিকর অভ্যাসের বিষয়ে আলোকপাত করেছেন, যা ক্যানসারের চিকিৎসাধীন রোগীর সেরে ওঠার পথকে জটিল করে তুলতে পারে। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে এসব অভ্যাস ক্যানসারের প্রত্যক্ষ কারণ বা চিকিৎসা ব্যর্থতার সরাসরি প্রমাণ নয়, বরং রোগের ধরন ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর এর প্রভাব নির্ভর করে। প্রথমত পেটের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর চারপাশে জমে থাকা ক্ষতিকর চর্বি বা ভিসেরাল ফ্যাট নিয়ে সতর্কতা জারি করেছেন চিকিৎসক শর্মা।
এই অভ্যন্তরীণ মেদ শরীরের হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি ইনসুলিনের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। রক্তে অতিরিক্ত ইনসুলিন ক্যানসার কোষের টিকে থাকা ও বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের একাধিক গবেষণায় বিশেষ করে স্তন ক্যানসারের জটিলতার সঙ্গে দেহের অভ্যন্তরীণ মেদের গভীর সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। দ্বিতীয়ত সারাদিন একটানা বসে থাকার প্রবণতা শরীরের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে।
পেশি সচল ও সক্রিয় থাকলে রক্তে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। দীর্ঘক্ষণ কাজ বা বিশ্রামের নামে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের চরম ক্ষতি ডেকে আনে। চিকিৎসকদের মতে রোগীর সক্ষমতা অনুসারে নিয়মিত হাঁটাচলা কিংবা অত্যন্ত মৃদু শারীরিক কসরত শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। তবে ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা না করে চিকিৎসকের অনুমোদন ছাড়া কোনো ভারী ব্যায়াম শুরু করা সম্পূর্ণ অনুচিত। তৃতীয়ত প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আসক্তি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
বসে থাকার দীর্ঘ অবসরে অনেকের মধ্যেই চিপস, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার এবং মিষ্টিযুক্ত কোমল পানীয় গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসকের মতে আঁশহীন এবং অতিমাত্রায় চিনিযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার শরীরের ওজন বৃদ্ধির পাশাপাশি বিপাক প্রক্রিয়াকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রোগীদের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, টাটকা ফলমূল, মানসম্মত প্রোটিন এবং আঁশযুক্ত পুষ্টিকর খাবার রাখা আবশ্যক।
চতুর্থ বিষয়টি হলো মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা। রোগ ধরা পড়ার পর রোগী ও তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা, চিকিৎসা ব্যয়ের দুশ্চিন্তা এবং মানসিক অস্থিরতা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্বেগ রোগীদের নিয়মিত ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসে বিপর্যয় ডেকে আনে। শারীরিক চিকিৎসার পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক যত্ন, পারিবারিক সহমর্মিতা এবং প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের সহায়তা নেওয়াকে জরুরি বিবেচনা করা উচিত।
সবশেষে চিহ্নিত করা হয়েছে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের সংকটকে। রাতে দেরিতে ঘুমানো, ঘুমানোর আগমুহূর্তে মোবাইল বা ডিজিটাল পর্দা স্ক্রল করা এবং গভীর উদ্বেগে বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া রোগীদের স্বাভাবিক পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়াকে থমকে দেয়। নিয়মিত এবং গভীর ঘুম দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে উজ্জীবিত রাখতে সাহায্য করে। ক্যানসার কোনো সহজ রোগ নয় এবং শুধুমাত্র জীবনযাত্রার বদল মূল চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না। চিকিৎসকের দিকনির্দেশনা মেনে সার্বিক থেরাপি অব্যাহত রাখা, সুষম খাবার গ্রহণ, সচল থাকা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করাই সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন