সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১১:৩৭ পিএম
মানুষের সহজাত স্বভাব ও ব্যক্তিত্বে ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক একটি বিষয়। সমাজে কেউ স্বভাবসুলভভাবে বেশি কথা বলতে পছন্দ করেন, আবার কেউ প্রয়োজন ছাড়া একেবারেই মুখ খোলেন না। এই স্বল্পভাষী মানুষদের অনেক সময় ভুল বুঝে সমাজ রহস্যময় কিংবা অহংকারী বলে চিহ্নিত করে থাকে। তবে মানুষের মুখনিঃসৃত কথা ও নীরবতার এই সংবেদনশীল বিষয়টি ইসলাম অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছে।
ইসলাম অনর্থক ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা থেকে দূরে থাকতে জোরালো তাগিদ দিয়েছে। তবে এর অর্থ কখনোই সারাক্ষণ মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকা নয়। কথার পরিমাণের চেয়ে কথার গুণগত মান এবং কল্যাণকামিতাই এখানে মুখ্য। এ প্রসঙ্গে একটি সুস্পষ্ট হাদিস রয়েছে। সহিহ বুখারির ৬০১৮ নম্বর এবং সহিহ মুসলিমের ৪৭ নম্বর হাদিসে নবী করিম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের ওপর ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। কথা যদি মানুষের জন্য উপকারী, সত্য ও সুন্দর উদ্দেশ্যে হয় তবে তা প্রকাশ করা উচিত। আর সেই কথা যদি গুনাহ, বিবাদ বা অনর্থক ঝামেলার কারণ হয়, তবে নীরবতাই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
জবানকে সংযত রাখাই বহু গুনাহ থেকে আত্মরক্ষার মূল চাবিকাঠি। মানুষের জীবনের সিংহভাগ ভুল ও পাপ সংঘটিত হয় অনিয়ন্ত্রিত কথার মাধ্যমে। পরনিন্দা, মিথ্যাচার, মিথ্যা অপবাদ, অশোভন আচরণ কিংবা অহেতুক তর্ক থেকে নিজেকে বাঁচানোর প্রধান উপায় হলো মুখের ভাষা সংযত রাখা। জামে তিরমিজির ২৫০১ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি নীরব থাকল, সে মুক্তি পেল।
মানুষ প্রতিটি মুহূর্তে যা উচ্চারণ করে, তার প্রতিটি শব্দের হিসাব লিপিবদ্ধ হয়। পবিত্র কুরআনের সুরা কাফের ১৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সতর্ক করে ঘোষণা করেছেন, মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তা সংরক্ষণের জন্য তার কাছেই একজন সদা প্রস্তুত পর্যবেক্ষক থাকে। তাই কম কথা বলা বা অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা যদি কাউকে পাপ থেকে দূরে রাখে, তবে তা নিঃসন্দেহেই এক অতুলনীয় গুণ।
হজরত মুহাম্মদ ছিলেন সংযত ও মিতভাষী আচরণের অনুপম আদর্শ। তিনি যেমন কোনোদিন অর্থহীন বাক্য ব্যয় করতেন না, তেমনই সাধারণ মানুষের সাথে মেলামেশা বা প্রয়োজনীয় যোগাযোগ থেকেও কখনো বিচ্ছিন্ন হতেন না। মুসনাদে আহমদের ৬৩০৮ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন এবং খুব কম হাসতেন। তিনি যখনই কোনো কথা বলতেন, তা হতো গভীর অর্থবহ, সত্য ও সার্বিক কল্যাণে পরিপূর্ণ।
তবে অন্যায় বা নিপীড়নের মুখে নীরব থাকার কোনো সুযোগ ইসলামে রাখা হয়নি। সমাজে কোনো অবিচার, জুলুম কিংবা কারো মৌলিক অধিকার পদদলিত হতে দেখলে সেখানে সত্যের পক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলা প্রত্যেক মুসলিমের নৈতিক দায়িত্ব। পবিত্র কুরআনের সুরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে সৎকাজের নির্দেশ ও অসৎকাজে বাধা প্রদানকে সর্বোত্তম উম্মতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চোখের সামনে স্পষ্ট অন্যায় প্রত্যক্ষ করেও ঝামেলা এড়ানোর স্বার্থে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকার মতো সুবিধাবাদী অবস্থানকে ইসলাম সমর্থন করে না।
কোনো মানুষ স্বল্পভাষী হলেই তাকে অহংকারী বা জটিল চরিত্রের ভাবার যেমন কোনো অবকাশ নেই, তেমনই কেবল সর্বদা নীরব থাকার কারণেই কাউকে পরম সাধু মনে করারও সুযোগ নেই। কখন কল্যাণকর কথা সাহসিকতার সাথে উচ্চারণ করতে হবে এবং কখন অনর্থক বিতর্ক বা ফেতনা এড়াতে জবান সংযত রাখতে হবে, সেই সুবিবেচনাই ইসলামী জীবনাচরণের প্রকৃত নির্যাস।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন