মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

প্রযুক্তি শিক্ষায় ২৩ হাজার কোটি টাকার নতুন তিন প্রকল্প

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

প্রযুক্তি শিক্ষায় ২৩ হাজার কোটি টাকার নতুন তিন প্রকল্প

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তুলতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণাগার স্থাপন থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষে ইন্টার্যাক্টিভ শিক্ষা প্যানেল, কেন্দ্রীয় লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও জাতীয় কনটেন্ট তথ্যভান্ডার স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় সাত লাখেরও বেশি শিক্ষকের হাতে ট্যাব তুলে দেওয়া হবে এবং দুই কোটি শিক্ষার্থীকে দেওয়া হবে স্মার্ট আইডি কার্ড। চব্বিশ ঘণ্টা শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রচারের জন্য ‍‍`বাংলাদেশ এডুকেশন টিভি‍‍` নামে একটি স্বতন্ত্র টেলিভিশন চ্যানেল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)।

এই পুরো রূপরেখা বাস্তবায়নে ২৩ হাজার ৪০৫ কোটি টাকার তিনটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্তির জন্য সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে এই তিন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠিয়েছে মাউশি। প্রস্তাবিত প্রকল্প তিনটি হলো—চার হাজার ৫০০ কোটি টাকার নির্বাচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রযুক্তি ল্যাব স্থাপন প্রকল্প, ১৮ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি ও স্মার্ট লার্নিং পরিবেশ স্থাপন প্রকল্প এবং ৪০০ কোটি টাকার বাংলাদেশ এডুকেশন টিভি প্রকল্প। একই সঙ্গে মূল প্রকল্পগুলোর সক্ষমতা যাচাইয়ে ১২ কোটি সাত লাখ টাকার আরও তিনটি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চার কোটি ৯১ লাখ, প্রযুক্তি ল্যাব স্থাপনে চার কোটি ২৯ লাখ এবং জাতীয় শিক্ষা টিভির জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে তিন কোটি ৫০ লাখ টাকা। সব প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে পাঁচ বছর, যা ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে বাজারমুখী শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন যুবশক্তি গঠনের যে অঙ্গীকার ছিল, তার আলোকেই এই মেগা কর্মযজ্ঞ হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চার হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রযুক্তি ল্যাব প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলার প্রতিটি উপজেলায় ১০টি করে মোট পাঁচ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হবে, যার মধ্যে থাকবে আটটি বিদ্যালয় ও দুটি কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণাগার গড়ে তোলা হবে। ল্যাব ব্যবহারের জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দেওয়া হবে বিশেষ অনলাইন ও অফলাইন প্রশিক্ষণ। শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণায় মেন্টরশিপ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে এবং মেধা যাচাইয়ে নিয়মিত আয়োজন করা হবে অলিম্পিয়াড, হ্যাকাথন ও প্রযুক্তি মেলা।

এই ল্যাব প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাবে দেখা যায়, বেতন-ভাতায় যাবে ৬০ কোটি টাকা, প্রযুক্তিগত হার্ডওয়্যার ও কিট সরবরাহে দুই হাজার কোটি, ল্যাব অবকাঠামো ও সিভিল কাজে ৭৫০ কোটি, সোলার প্যানেল ও অনলাইন ইউপিএসে ৫০০ কোটি, সফটওয়্যারে ২৫০ কোটি, দুই লাখ শিক্ষক প্রশিক্ষণে ১৭৫ কোটি, ২০টি প্রতিযোগিতা আয়োজনে ২০০ কোটি, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় ৮০ কোটি এবং আপৎকালীন ব্যয়ে ধরা হয়েছে ৪০ কোটি টাকা। মাউশির পরিকল্পনা শাখার কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক ল্যাব হওয়ায় শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল বৈষম্য কমবে এবং তারা উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। দ্বিতীয় ও সর্ববৃহৎ প্রকল্পটির মাধ্যমে দেশের ১০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখ শ্রেণিকক্ষে ইন্টার্যাক্টিভ শিক্ষা প্যানেল স্থাপন করা হবে। সেখানে ১০০ এমবিপিএস গতির ব্রডব্যান্ড সংযোগ ও ক্যাম্পাস এরিয়া নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। চালু হবে সমন্বিত এডু আইডি ও স্মার্টকার্ড, কেন্দ্রীয় লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং সেন্ট্রাল মনিটরিং ব্যবস্থা। সাত লাখের বেশি শিক্ষককে দেওয়া হবে আধুনিক ট্যাবলেট কম্পিউটার এবং ইন্টার্যাক্টিভ পাঠদানের ওপর তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এই প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে শ্রেণিকক্ষের প্যানেলে পাঁচ হাজার কোটি, শিক্ষকদের ট্যাবে দুই হাজার ৮০০ কোটি এবং তাদের প্রশিক্ষণে দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সার্ভার ও দুই কোটি শিক্ষার্থীর স্মার্টকার্ডে ব্যয় হবে ছয় হাজার কোটি, প্রশাসনিক কাজে ১২০ কোটি এবং কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এতে প্রতি শিক্ষকের ট্যাবে গড় খরচ ধরা হয়েছে ৪০ হাজার এবং শিক্ষার্থীর কার্ডের পেছনে খরচ হবে তিন হাজার টাকা। বিশেষায়িত সম্প্রচার মাধ্যমের অভাবে অডিও-ভিজ্যুয়াল পাঠ থেকে বঞ্চিত হওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আসছে ২৪ ঘণ্টার ‍‍`বাংলাদেশ এডুকেশন টিভি‍‍`।

চারশত কোটি টাকার এই সম্প্রচার প্রকল্পে ডিজিটাল ব্রডকাস্টিং স্টুডিও স্থাপনে ব্যয় হবে ৭৫ কোটি টাকা। স্যাটেলাইট ট্রান্সপন্ডার লিজ, স্পেকট্রাম ফি ও আপলিংক চার্জে ২২০ কোটি, সার্ভার ও তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামোয় ৫০ কোটি এবং ডাউনলিংক ফি বাবদ ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ওটিটি ও মোবাইল অ্যাপ তৈরিতে ৩০ কোটি, শিক্ষকদের মিডিয়া প্রশিক্ষণে ১৫ কোটি, কারিগরি কর্মকর্তাদের দক্ষতায় ১০ কোটি, বেতন-ভাতায় ২৫ কোটি এবং প্রশাসনিক খাতে ৩০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। যদিও ডিজিটাল শিক্ষার নামে বিগত এক দশকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একাধিক প্রকল্প নেওয়া হলেও তার দৃশ্যমান সুফল মেলেনি।

এক হাজার ২৩৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবগুলোর অধিকাংশই এখন অকেজো ও তালাবদ্ধ। ব্যানবেইসের ৩৫৩ কোটি টাকার আইইআইএমএস প্রকল্পের আওতায় এক কোটি ৬০ লাখ শিক্ষার্থীকে ইউনিক আইডি দেওয়ার কথা থাকলেও ১০৮ কোটি টাকা খরচের পর কার্ড পায়নি শিক্ষার্থীরা; উল্টো সফটওয়্যার সংক্রান্ত জটিলতায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও সনদ সংশোধনে জটিলতায় পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। এর বাইরে সরকারি কলেজে বিজ্ঞান শিক্ষা সম্প্রসারণের দুই হাজার ৫১১ কোটি টাকা, বেসরকারি কলেজ উন্নয়নের সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা এবং আইসিটি সম্প্রসারণের এক হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার প্রকল্পগুলোও অবকাঠামো গড়ার আগেই কেনাকাটা শেষ করায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ জানান, প্রযুক্তিগত প্রকল্পের যৌক্তিকতা থাকলেও আগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে মারাত্মক ঘাটতি ছিল এবং উপযুক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, পুরোনো দুর্বলতা পর্যালোচনা করে নতুন কাজে হাত দেওয়া দরকার, যাতে আগের তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

মাউশির সাবেক মহাপরিচালক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো ও দক্ষ শিক্ষক তৈরি না করে শুধু কেনাকাটাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রকল্প নিলে তা মাঠে মারা যাবে। তার পরামর্শ, পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পে প্রথম দুই বছর শুধু প্রশিক্ষণে দেওয়া উচিত, তৃতীয় বছর শুরু করে চতুর্থ বছরে গিয়ে তা চালু করা দরকার; অন্যথায় বিপুল অর্থ খরচ করে জাতীয় অর্থনীতিতে চাপ বাড়লেও শিক্ষায় কোনো গুণগত ফল আসবে না।

মাউশির পরিকল্পনা উইংয়ের পরিচালক অধ্যাপক ড. মীর জাহীদা নাজনীন জানান, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের সবুজ তালিকায় অন্তর্ভুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে এবং অনুমোদন মিললে পরবর্তী সম্ভাব্যতা যাচাই কার্যক্রম শুরু হবে।