জুন ১১, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা এখন আর সাধারণ কোনো ঘটনার পর্যায়ে নেই; এটি রূপ নিয়েছে একটি ভয়াবহ ও নিয়মিত জাতীয় সংকটে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে যেসব দুর্ঘটনার খবর প্রকাশ পায়, তা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় অনেক কম। লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যাচ্ছে অনেক প্রাণহানির তথ্য। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার করুণ ইতিহাস।
অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করে কাটাচ্ছেন অভিশপ্ত জীবন। উপার্জনের পথ হারিয়ে অনেক পরিবার পড়ছে চরম আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ে। সড়ক দুর্ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং পুরো সমাজের জন্যই এক বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ২ হাজার ৪০৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১৩৬ জন নিহত এবং ৬ হাজার ২৯ জন আহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নতি প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, ট্রাফিক আইন না মানা, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা এবং চালকদের বেপরোয়া মনোভাব। এছাড়া অরক্ষিত রেললাইন, অতিরিক্ত গতি, অবৈধ ওভারটেকিং, রোড ডিভাইডার না থাকা, ভাঙা রাস্তা এবং পথচারীদের অসচেতনতা দুর্ঘটনার হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে মোটরসাইকেল, ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে বড় ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
এই মহামারি থেকে মুক্তি পেতে সম্মিলিত পদক্ষেপ জরুরি। চালকদের সবসময় ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালাতে হবে। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী—উভয়কেই হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা বা হেডফোনে গান শোনা পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। রাস্তায় ফাঁকা পেলেই ওভারটেকিং বা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করার প্রবণতা ত্যাগ করতে হবে। চালকদের বুঝতে হবে, রাস্তায় তাঁরা একা নন, বাসায় পরিবারের সদস্যরা তাঁদের অপেক্ষায় আছেন।
পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে। নিরাপদে রাস্তা পারাপারের নিয়ম জানা ও মানা জরুরি। রাস্তা পারাপারের সময় ফুটওভার ব্রিজ বা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের দায়িত্ব আরও ব্যাপক। চালকদের সঠিক প্রশিক্ষণ ও আসল লাইসেন্স দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। ভাঙাচোরা রাস্তা দ্রুত মেরামত এবং ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পুলিশি দুর্নীতি বন্ধ করাও এই সংস্কারের অংশ।
সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের সচেতনতা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের এখনই কঠোর ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন