সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম
সবুজ চাদরে মোড়ানো পাহাড় আর দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ হিসেবে পরিচিত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে নিয়মিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর বাইরেও রয়েছে চোখজুড়ানো অসংখ্য প্রাকৃতিক দৃশ্যপট।
ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে সরাসরি শ্রীমঙ্গলে পৌঁছানো সম্ভব। ট্রেনে শ্রেণিভেদে জনপ্রতি ভাড়া ২৭৫ থেকে ৬৫০ টাকা, যার টিকিট অন্তত এক সপ্তাহ আগে সংগ্রহ করতে হয়। অন্যদিকে নন-এসি বাসে জনপ্রতি ভাড়া ৫০০ টাকা এবং এসি বাসে ভাড়া এক হাজার টাকা পর্যন্ত। সকাল সাতটায় শ্রীমঙ্গলের প্রাণকেন্দ্র চৌমোহিনী বাজারে পৌঁছে মাত্র ৭০ টাকায় সকালের নাস্তা সেরে নেওয়া যায় রিজিক রেস্টুরেন্টে। বাজারের সামনে অপেক্ষমাণ চাঁদের গাড়ি বা সিএনজিচালিত অটোরিকশার মধ্যে পুরো দিনের জন্য এক হাজার ৮০০ টাকায় একটি অটোরিকশা ভাড়া করে পুরো দিনের ভ্রমণ শুরু করা সুবিধাজনক। ভ্রমণের প্রথম আকর্ষণ হতে পারে হরিণছড়া গলফ ক্লাব মাঠ। সবুজ ঘাসের গালিচা ও পাহাড়ের ছায়াঘেরা শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত এই স্থানটিকে অনেকেই স্থানীয় পরিসরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করেন।
এর পাশেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া শ্রীমঙ্গলের পাইন বন। উঁচু পাইন গাছের সারির ভেতর দিয়ে আসা মিষ্টি রোদ এবং লাগোয়া চা বাগানের দৃশ্য দর্শনার্থীদের ছবি তোলার জন্য আকৃষ্ট করে। এরপরের গন্তব্য হতে পারে বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা নুরজাহান টি গার্ডেন। বিশাল ক্যানভাসের মতো ঢেউখেলানো এই বাগানে প্রতিদিন নারী চা শ্রমিকেরা পাতা উত্তোলন করেন। বাগানের শ্রমিকেরা জানান, দৈনিক ২২ কেজি চা পাতা তোলার বিনিময়ে তারা মাত্র ১৭৮ টাকা মজুরি পান, যা দীর্ঘ প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কাপে পৌঁছায়। পরবর্তী মূল কেন্দ্র এক হাজার ২৫০ হেক্টর আয়তনের সমৃদ্ধ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। বনে প্রবেশের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের টিকিট ফি ১১৫ টাকা এবং ১২ বছরের নিচের শিশুদের জন্য ৫৭ টাকা নির্ধারিত। বনের ভেতরে হাঁটার পথে বহু প্রাচীন ও অচেনা বৃক্ষের দেখা মেলে। প্রধান ফটক থেকে পাঁচ মিনিট হাঁটলে শ্রীমঙ্গল-সিলেট রেললাইনের দেখা পাওয়া যায়, যেখানে ১৯৫৫ সালে চিত্রায়িত ও ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র `অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেইজ` এবং হুমায়ূন আহমেদের বাংলা চলচ্চিত্র `আমার আছে জল`-এর দৃশ্যধারণ করা হয়েছিল। রেললাইনের সামনে নারীদের জন্য প্রসাধন কক্ষ রয়েছে এবং বনের গভীরে রয়েছে অবাধে ঘুরে বেড়ানো বানরের দল। বাঁ দিকে হেঁটে গেলে পাওয়া যাবে আদিবাসী খাসিয়া জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাসিয়াপুঞ্জি, যেখানে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঘরবাড়ি প্রত্যক্ষ করা যায়।
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় নয় কিলোমিটার দূরে এমআর খান চা বাগানের সাত নম্বর সেকশনটি ভারতের দার্জিলিংয়ের চা বাগানের মতো স্তরে স্তরে সাজানো হওয়ায় এটি দার্জিলিং টিলা নামে পরিচিত। বর্তমানে মূল প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় সাধারণ পর্যটকদের কিছুটা ঘুরে বিকল্প পথে পৌঁছাতে হয়। ফুলছড়া বাজার থেকে রঞ্জিত নামের স্থানীয় গাইড নিয়ে চা বাগানের সরু পথ, পাহাড়ি ট্রেইল ও পাথুরে ঝিরি পেরিয়ে এই টিলায় ট্রেকিং করে পৌঁছানো যায়। টিলা ভ্রমণ শেষে এমআর খান বাজারে ফিরে স্থানীয় অটোরিকশায় জনপ্রতি ৫০ টাকা ভাড়ায় শ্রীমঙ্গল শহরে ফেরা যায়।
ভ্রমণ তালিকায় যুক্ত করা যায় সাতগাঁও চা বাগান সংলগ্ন চব্বিশ ফুট উঁচু ঐতিহাসিক `চা কন্যা` ভাস্কর্য। ২০০৯ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মুফিজুল ইসলাম ও বাগান কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এটি নির্মাণের কাজ শুরু হয়। চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির ভাস্কর সঞ্জিত রায় তিন মাস কাজ করে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ভাস্কর্যটি নির্মাণ সম্পন্ন করেন, যা নারী চা শ্রমিকদের শ্রমের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। সময় থাকলে পর্যটকেরা ঐতিহ্যবাহী নীলকণ্ঠ চায়ের কেবিনে গিয়ে নানা স্তরের বিশেষ চায়ের স্বাদ নিতে পারেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন