সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ০৬:৫১ পিএম
রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ৪৩ কিলোমিটার দূরে গাজীপুরের ভাওয়াল গড়ের বিস্তৃত শালবনে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ উন্মুক্ত বন্যপ্রাণী কেন্দ্র গাজীপুর সাফারি পার্ক। প্রায় তিন হাজার ৬৯০ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই পর্যটন কেন্দ্রে চিড়িয়াখানার মতো প্রাণীদের আবদ্ধ না রেখে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিচরণ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দর্শনার্থীরা সুরক্ষিত বিশেষায়িত বাসে চড়ে বনের ভেতর অবাধে ঘুরে বেড়ানো বাঘ, সিংহ ও বন্যপ্রাণীদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান।
বনের বুক চিরে চলা এই যাত্রায় খাঁচায় বন্দি থাকে মানুষ, আর মুক্ত থাকে বন্যপ্রাণী। সাফারি পার্কের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অংশ হলো এর কোর সাফারি। এক হাজার ৩৩৮ একর আয়তনের এই কোর সাফারিতে ২১ একর জায়গা জুড়ে রয়েছে পশুর রাজা সিংহের নিজস্ব রাজ্যপাট। আফ্রিকান সিংহ সাফারিতে বর্তমানে ১১টি পূর্ণবয়স্ক সিংহ-সিংহী এবং ১৮টি শাবক রয়েছে। দিনে ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টা ঘুমিয়ে বা বিশ্রাম নিয়ে কাটানো এই প্রাণীর গর্জন প্রায় আট কিলোমিটার দূর থেকেও স্পষ্টভাবে শোনা যায়। এর পাশাপাশি নিজস্ব আবাসস্থলে রাজকীয় ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়ায় বাংলাদেশের জাতীয় পশু রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
শালবনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে চরে বেড়ায় বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা স্তন্যপায়ী প্রাণী জিরাফ। যার ছয় ফুট উচ্চতার নবজাতকও সাধারণ মানুষের চেয়ে লম্বা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের লেজ প্রায় স্তন্যপায়ীদের মধ্যে দীর্ঘতম। একই সঙ্গে খোলা প্রান্তরে দলবেঁধে ছুটোছুটি করে জেব্রা ও আফ্রিকার শিংওয়ালা ওয়াইল্ডবিস্ট। হরিণের বিভিন্ন প্রজাতির জন্য রয়েছে বিশাল এলাকা; যার মধ্যে ৮১ একরে চিত্রা হরিণ, ২২ একরে মায়া ও প্যারা হরিণ এবং ৮০ একর এলাকাজুড়ে রয়েছে গয়াল ও সাম্বার হরিণ। এ ছাড়া রয়েছে বিশেষ শিংযুক্ত থমসনস গ্যাজেল, ব্লেক বক এবং জেমস বক নামে পরিচিত সুদর্শন ওরিক্স গ্যাজেল। কোর সাফারির বাইরে পায়ে হেঁটে ঘোরার জন্য সাজানো হয়েছে মনোরম সাফারি কিংডম। এর উন্মুক্ত জলাশয়ে দলবেঁধে জলকেলি করে রাজহাঁস ও লম্বা গলার বিরল ব্ল্যাক সোয়ান। পাশের শৈবালময় জলাধারে রয়েছে আফ্রিকার জলহস্তী, আর গভীর খাঁচায় রাখা হয়েছে তীব্র দৃষ্টিশক্তির অধিকারী নীল নদের কুমির ও বিপন্ন প্রজাতির ঘড়িয়াল। কুমির ডাঙ্গায় থাকা অবস্থায় মুখ হাঁ করে বাড়তি শারীরিক উত্তাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং এরা ঘণ্টায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার গতিতে সাঁতার কাটতে পারে। সরীসৃপপ্রেমীদের জন্য রয়েছে গন্ধ শুঁকে শিকার শনাক্ত করতে পারা লম্বা গুইশাপ ও বিভিন্ন প্রজাতির বিশালাকার অজগর।
পাখিশালায় রয়েছে রাজধনেশ, পেলিক্যান, ঝঁটিওয়ালা গ্রে ক্রাউন ক্রেন এবং জলচর কালিম পাখি। এ ছাড়া ম্যান্ডারিন ডাক, ক্যারোলিনা ডাক এবং মেকাউ ল্যান্ডে রয়েছে মানুষের কণ্ঠ অনুকরণে সক্ষম বুদ্ধিমান মেকাউ ও সাদা কাকাতুয়া। বিশেষ প্রজনন কেন্দ্রে বিলুপ্তপ্রায় শকুনদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পার্কে আসা দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা ৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হওয়া ও লাফিয়ে চলা ম্যাক্রোপাস পরিবারের ক্যাঙ্গারু এবং উচ্চতায় ৩৪ ইঞ্চির নিচে থাকা নাদুসনুদুস মিনি হর্স।
সাফারি কিংডমে আরও রয়েছে প্রায় দুই হাজার প্রজাতির মেরিন অ্যাকোয়ারিয়াম, প্রজাপতি কর্নার এবং স্টাফিং করা নমুনা সমৃদ্ধ নেচার হিস্ট্রি মিউজিয়াম। দর্শনার্থীদের বিশ্রামের জন্য তৈরি করা হয়েছে চমৎকার বিশ্রামাগার, ওয়াচ টাওয়ার এবং খাঁচাবেষ্টিত সিংহ রেস্তোরাঁ ও ফুড কোর্ট। প্রাণীদের জীবনযাপনের বিঘ্ন না ঘটিয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর দারুণ এক পরিবেশ তৈরি করেছে এই উদ্যান।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন