শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
প্রাণিসম্পদ বিপ্লব

১৩০ কেজির মাংসল ডরপার: খামারে লাখ টাকার নতুন স্বপ্ন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ০৬:৫৮ পিএম

১৩০ কেজির মাংসল ডরপার: খামারে লাখ টাকার নতুন স্বপ্ন

বিশ্বজুড়ে মাংসের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় ও দ্রুত বর্ধনশীল জাতের গবাদিপশু ডরপার ভেড়া পালন করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন তিন প্রবাসী ফেরত ভাই। সাধারণ ভেড়া বা ছাগলের তুলনায় অত্যন্ত দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক কম চর্বিযুক্ত সুস্বাদু মাংসের কারণে বাংলাদেশে দিন দিন এই জাতের চাহিদা বাড়ছে। ২০০১ সালে ব্রুনাই গিয়ে সুবিধা করতে না পারা এক প্রবাসী ভাইয়ের উদ্যোগে পরিবারের তিন ভাই একত্রিত হয়ে গড়ে তুলেছেন এই আধুনিক ভেড়ার খামার।

উচ্চ প্রজননক্ষমতা আর দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধিই ডরপার পালনের আসল শক্তি। অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের সুবাদে তাদের বড় ভাই প্রথম এই ব্যতিক্রমী মাংসের জাতের সন্ধান পান। পরবর্তীতে রাজধানী ঢাকা থেকে অস্ট্রেলিয়া ফেরত এক আমদানিকারকের মাধ্যমে প্রতিটি প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা খরচে ১৩টি মূল ডরপার সংগ্রহ করে ২০২৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর খামারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। প্রায় আড়াই বছরের মাথায় খামারে ডরপারের সংখ্যা এখন একশত ছাড়িয়ে গেছে। খামারে বর্তমানে ৪০ থেকে ৪৫টি প্রজননক্ষম মা ডরপার রয়েছে, যা বছরে অন্তত দুইবার বাচ্চা প্রসব করে। প্রতি ১৩ মাসে গড়ে দুইবার বাচ্চা দেওয়ার পাশাপাশি মাত্র চার বছরে একটি মা ডরপার থেকে আটটি পর্যন্ত বাচ্চা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

ডরপারের বৃদ্ধির হার অন্যান্য গবাদিপশুর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মাত্র ১৫ দিন বয়সের একটি বাচ্চার ওজন প্রায় ১০ কেজি এবং ২৫ দিন বয়সে তা ২০ থেকে ২৫ কেজিতে পৌঁছায়, যেখানে সমবয়সী ছাগলের বাচ্চার ওজন হয় মাত্র চার থেকে পাঁচ কেজি। এদের মধ্যে সাদা রঙের অস্ট্রেলিয়ান জাত এবং কালো মাথা ও সাদা শরীরের আফ্রিকান জাত মূল প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। একটি পূর্ণবয়স্ক পাঠার ওজন সর্বোচ্চ ১৩০ কেজি এবং মা ডরপারের ওজন ১১৭ থেকে ১২০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাধারণ দুম্বার মতো এদের পেছনে অতিরিক্ত চর্বির থলি থাকে না এবং বছরে দুইবার লোম কাটার ঝামেলা ছাড়াই এদের শরীরের লোম প্রাকৃতিকভাবে নিজে থেকেই ঝরে পড়ে। খাবারের তালিকায় এরা অত্যন্ত সহনশীল হওয়ায় যে কোনো সাধারণ খাবার খেয়েই বেঁচে থাকতে পারে। খামারিরা প্রধানত নিজস্ব জমিতে চাষ করা ভুট্টা থেকে তৈরি সাইলেজের ওপর নির্ভর করেন, যা প্রায় ১৪ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করে খাওয়ানো যায়। এর পাশাপাশি নেপিয়ার ও জার্মান ঘাস সরবরাহ করা হয়। জন্মের পর চার থেকে পাঁচ মাস পর্যন্ত বাচ্চা কেবল মায়ের দুধের ওপর নির্ভর করে বড় হয়। পাঁচ মাস পর বুকের দুধ ছেড়ে দিলে প্রতিটি বাচ্চার পেছনে লালন-পালন বাবদ ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়, যা দশ মাস বয়সে ন্যূনতম ৬০ হাজার টাকায় বাজারজাত করা সম্ভব।

বর্তমানে ছয় মাস বয়সী বাচ্চা প্রতিটি ৫০ হাজার টাকায় এবং পূর্ণবয়স্ক প্রজননক্ষম পাঠা এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। গর্ভবতী বা পূর্বে বাচ্চা দেওয়া মাদি ডরপার বিক্রি হচ্ছে এক লাখ ১০ হাজার থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। দেশীয় প্রান্তিক চাষিদের ক্রয়ক্ষমতার কথা চিন্তা করে তারা ভারতীয় গারল মাদি ভেড়ার সঙ্গে পিওর ডরপার পাঠার ক্রসব্রিডিং করাচ্ছেন। প্রথম প্রজন্মে প্রায় ৭০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় প্রজন্মে প্রায় অরিজিনালের সমতুল্য শারীরিক গঠন ও ওজনের বাচ্চা পাওয়া গেছে। চলতি মৌসুমে কোরবানিকে সামনে রেখে খামার থেকে ইতিমধ্যে এক লাখ টাকার বেশি দরে প্রায় ২০টি ডরপার বিক্রি করে সম্পূর্ণ বিনিয়োগ লাভ হিসেবে তুলে নেওয়া হয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।