সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম
অতীতে মাথায় টাক পড়া বা চুল পড়ে পাতলা হয়ে যাওয়াকে কেবল বয়স বাড়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বর্তমান সময়ে দৃশ্যপট অনেকটাই বদলে গিয়ে ২০ বছর বয়সেই অনেক তরুণের কপালের দুই পাশ থেকে চুল ফাঁকা হওয়া কিংবা মাথার মধ্যভাগে ঘনত্ব দ্রুত কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ প্রকট হচ্ছে। ভারতের প্রখ্যাত চিকিৎসক রাশি সোনির মূল্যায়ন অনুযায়ী, তরুণ বয়সে চুল পড়ার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয় বরং বংশগত প্রবণতার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত মানসিক চাপ, ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস ও সামগ্রিক জীবনযাপনের প্রভাব এতে বড় ভূমিকা রাখে।
তরুণ বয়সে চুল পড়ে যাওয়ার মূল কারণগুলোর মধ্যে জেনেটিক প্রভাব অন্যতম। কপালের দুই পাশ থেকে চুল ক্রমাগত পেছনের দিকে সরে যাওয়া কিংবা মাথার ওপরের অংশ দ্রুত পাতলা হয়ে যাওয়ার প্রধান বৈজ্ঞানিক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেসিয়াকে। এটি পুরুষদের বংশগত টাক পড়ার চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত রূপ। জিনগত কাঠামোর কারণে অনেকের চুলের ফলিকল অ্যান্ড্রোজেন হরমোন, বিশেষ করে ডিএইচটি (DHT)-এর প্রতি অস্বাভাবিক মাত্রায় সংবেদনশীল থাকে।
এর ফলে সময়ের সাথে চুলের অভ্যন্তরীণ ফলিকল সংকুচিত হয়ে আসে এবং গজানো নতুন চুল স্বাভাবিকের তুলনায় দুর্বল, পাতলা ও খাটো হতে শুরু করে। তবে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী এই বৈশিষ্ট্য কেবল মাতৃকুল থেকে আসে তা সঠিক নয়, বরং পরিবারের উভয় দিকের বংশগতির ইতিহাসই এখানে সমানভাবে কার্যকর। প্রাত্যহিক মানসিক চাপ ও শারীরিক অসুস্থতাও দ্রুত চুল পড়ার জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী হতে পারে। শিক্ষাজীবনের তীব্র পরীক্ষার চাপ, কর্মক্ষেত্রের উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা, ঘুমের অনিয়ম, অপরিকল্পিতভাবে দ্রুত ওজন কমানো কিংবা কোনো জটিল রোগের সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠার পর অনেকের অস্বাভাবিক হারে চুল ঝরতে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় টেলোজেন ইফ্লুভিয়াম।
এই জটিলতায় স্বাভাবিক চক্র ভেঙে অতিরিক্ত সংখ্যক চুল একসাথে ঝরে পড়ার দশায় প্রবেশ করে। অনেক ক্ষেত্রে মূল মানসিক চাপ বা শারীরিক অসুস্থতা কেটে যাওয়ার কয়েক মাস পর চুল ঝরা শুরু হওয়ায় ভুক্তভোগীরা তাৎক্ষণিকভাবে এর মূল উৎস শনাক্ত করতে ব্যর্থ হন। শারীরিক কসরতকারী তরুণদের মধ্যে জিমের ক্রিয়েটিন সাপ্লিমেন্ট সেবন নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ থাকলেও এর কোনো চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রিয়েটিন সরাসরি চুল পড়ার কারণ হিসেবে কাজ করে এমন কোনো অকাট্য প্রমাণ চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেলেনি। কিছু প্রাথমিক গবেষণায় এটি গ্রহণের ফলে ডিএইচটি হরমোনের তারতম্যের ইঙ্গিত মিললেও সেই পরিবর্তনের কারণেই সরাসরি স্থায়ী চুল পড়ে যায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য তথ্য এখনো অনুপস্থিত।
খাদ্যাভ্যাসে অসচেতনতাও চুল পড়ার সমস্যাকে বহুলাংশে ত্বরান্বিত করে। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিনের ঘাটতি, চরম ক্যালোরি নিয়ন্ত্রিত ক্র্যাশ ডায়েট কিংবা শরীরে আয়রনসহ জরুরি মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের অভাব দেখা দিলে চুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুষ্টির তীব্র সংকট তৈরি হলে মানবদেহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হৃদ্যন্ত্র বা মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে চুলের স্বাভাবিক পুষ্টি সরবরাহ কমিয়ে দেয়।
চুল পড়া লক্ষ্য করলেই চিকিৎসকের নির্দেশনা ছাড়া বাজার থেকে নির্বিচারে ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা কোনো টেকসই সমাধান নয়। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার মাধ্যমে মূল কারণ নির্ণয় করা এবং পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে শৃঙ্খলা বজায় রাখাই চুল রক্ষার মূল উপায়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন