শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
ভেষজ চাষে সাফল্য

রোজেলা চা চাষে নাটোরে লাখপতি শহিদুল ইসলাম

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ০৭:৩০ পিএম

রোজেলা চা চাষে নাটোরে লাখপতি শহিদুল ইসলাম

নাটোর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে রোজেলা চা ও ঔষধি ভেষজ চাষ করে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন কৃষক শহিদুল ইসলাম। দেশের মানুষের কাছে ঔষধি গ্রাম নামে সুপরিচিত এই জনপদে প্রায় চার দশক ধরে বিষমুক্ত ও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে বিভিন্ন প্রজাতির ভেষজ চাষ হচ্ছে। প্রায় ৩৫ বছর ধরে ভেষজ কৃষির সাথে যুক্ত শহিদুল ইসলাম স্থানীয়ভাবে চুকাগোটা বা মেস্তা নামে পরিচিত রোজেলা চাষ ও নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তৈরি করছেন স্বাস্থ্যসম্মত লাল চা।

মাটির খাঁটি ভেষজ উপাদানই স্থানীয় কৃষকদের স্বাবলম্বী হওয়ার মূল চাবিকাঠি। স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে আফাজউদ্দিন পাগলা নামে এক ব্যক্তির হাত ধরে এই অঞ্চলে ভেষজ চাষের সূচনা হয়েছিল। বর্তমানে এই গ্রামের সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির এবং অপ্রচলিত আরও দুই থেকে আড়াইশত জাতের ভেষজ গাছ উৎপাদন করছেন। শহিদুল ইসলাম রাসায়নিক সার বা কীটনাশকের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করেন এবং ক্ষতিকর ছত্রাক প্রতিরোধে অ্যালোভেরা ও অন্যান্য গাছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে চুন প্রয়োগ করেন।

অ্যালোভেরার জমিতে পানি ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি সাশ্রয়ী দেশীয় পাইপ দিয়ে বিশেষ স্প্রিংকলার সেচ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছেন। যেখানে বাইরে থেকে স্প্রিংকলার আনতে বিঘাপ্রতি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা খরচ হতো, সেখানে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় তিনি এ পদ্ধতি চালু করেছেন। তার এই মডেল দেখে এলাকার প্রায় ৭১ জন কৃষক ইতিমধ্যে তাদের জমিতে স্প্রিংকলার সেচ বসিয়েছেন। এক বিঘা জমিতে ১০ ইঞ্চি দূরত্বে গাছ এবং আড়াই ফুট প্রশস্ত নালা তৈরি করে অ্যালোভেরা চাষ করা হয়। প্রতি মাসে বা বর্ষায় ২০ থেকে ২৫ দিন পরপর নিচের ডাল কেটে বিক্রি করা যায়, যা থেকে বছরে এক বিঘা জমিতে এক লাখ টাকা খরচ করে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় সম্ভব। শহিদুল ইসলামের সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে রোজেলা চা প্রক্রিয়াজাতকরণে। ফুল ঝরে যাওয়ার ২৫ থেকে ৩০ দিন পর নভেম্বর ও ডিসেম্বরের শীত মৌসুমে এর লাল ফল সংগ্রহ করা হয়। এরপর নিজস্ব যন্ত্রের সাহায্যে ভেতরের বীজ আলাদা করে পলি ড্রায়ার ও বৈদ্যুতিক ড্রায়ারে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে শুকিয়ে সারা বছরের জন্য গুদামজাত করা হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য তিনি দুই লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে নিজস্ব ড্রায়ার স্থাপন করেছেন। ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ এই চা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ ও উচ্চ রক্তচাপ কমাতে কার্যকর বলে সমাদৃত হচ্ছে।

প্রতি ৩৩ শতক বা এক বিঘা জমিতে চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ বাবদ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয়ের বিপরীতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কেজি শুকনো রোজেলা পাওয়া যায়। প্যাকেটজাত এই পণ্য তিনি পাইকারিতে দুই হাজার টাকা এবং খুচরায় তিন হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। এ ছাড়া সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ৫০ গ্রামের প্রতিটি অনুমোদিত প্যাকেট ১৫০ টাকায় বাজারে ছাড়া হচ্ছে। স্থানীয় পাইকারদের মাধ্যমে প্রতিদিন নাটোরের ঔষধি গ্রাম থেকে ঢাকা ও বিভিন্ন জেলায় আট থেকে দশ টন ভেষজ কাঁচামাল সরবরাহ করা হচ্ছে।