সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
সিলেটের সীমান্তঘেঁষা জনপদ জৈন্তাপুর মেঘ ও বৃষ্টির এক অনন্য রাজ্য। একদিকে ভারতের মেঘালয়ের আকাশছোঁয়া খাসিয়া-জৈন্তা পর্বতমালা, অন্যদিকে পাহাড় থেকে নেমে আসা অসংখ্য ঝরনা ও স্বচ্ছ জলধারা একে দেশের অন্যতম বৈচিত্র্যময় পর্যটন ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এই জনপদে পৌঁছানোর পর সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে শ্রীপুর পাহাড়ি উপত্যকায় চোখে পড়ে প্রকৃতির রূপ। সেখানে খাসিয়া পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার পানি জমে পাহাড়ি ছড়া এবং পরে রাংপানি নদীতে রূপ নিয়ে সারি গোয়াইন নদীতে গিয়ে মিশেছে।
প্রকৃতির সবুজ আর হাজার বছরের ইতিহাস জৈন্তাপুরকে দিয়েছে অমরত্ব। পৌরাণিক কাল থেকে মুঘল আমল পর্যন্ত নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই জৈন্তাপুর। খাসিয়া ভাষায় `ইয়ানতাপার` শব্দের অর্থ নিজের ভূমি বা আপন দেশ, যা থেকে কালক্রমে জৈন্তিয়া এবং পরে আজকের জৈন্তাপুর নামের উৎপত্তি। শ্রীপুর থেকে নয় কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে উপজেলা সদরে অবস্থিত খাসিয়া রাজবাড়ি। একসময় এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন ২৩ জন খাসিয়া রাজা। রাজবাড়ি ও প্রাচীন জৈন্তেশ্বরী মন্দিরের মূল ভবন ধসে পড়লেও টিকে রয়েছে অলংকৃত পূজাবেদী, যেখানে অতীতে রাজপরিবারের পূজা অনুষ্ঠিত হতো। লোকশ্রুতি রয়েছে, রাজা দ্বিতীয় বড় গোসায়ের আমলে তার ভাগ্নে সেনাপতি ফতেহ খানকে এই এলাকার একটি কুয়ায় বলি দেওয়া হয়েছিল।
রাজবাড়ির সামনে রয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন মেগালিথ স্তম্ভ, যা বাংলাদেশের আর কোথাও দেখা যায় না। প্রত্নতত্ত্বের ভাষায় এখানকার উঁচু পাথরের স্তম্ভগুলোকে `মেনহির` এবং আনুভূমিক পাথরের স্ল্যাবগুলোকে `ডলমেন` বলা হয়। ধারণা করা হয়, প্রায় এক হাজার ৩০০ থেকে তিন হাজার ২০০ বছর আগে সৌর বর্ষপঞ্জি বা স্মৃতিসৌধ হিসেবে এই অভিনব প্রস্তর স্তম্ভগুলো নির্মিত হয়েছিল। এ ছাড়া জৈন্তাপুর-জাফলং সড়কের পাশে অবস্থিত রাজা দ্বিতীয় রামসিংহের আমলে নির্মিত প্রায় আড়াইশ বছরের পুরনো এক অর্ধপ্রথিত দোচালা পান্থশালা এখনও প্রাচীন স্থাপত্যের প্রমাণ হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বহতা সারি নদী এই জনপদের আরেক আকর্ষণ। এই অঞ্চলে বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যার ফলে বর্ষায় নদীটি উত্তাল রূপ ধারণ করে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, সুদূর অতীতে সমতল জৈন্তাপুর সাগরের পানির নিচে ছিল। উজান থেকে নেমে আসা ভাসান পানিতে এখনো নিচু জমি প্লাবিত হয়, যেখান থেকে স্থানীয়রা বছরে প্রায় আড়াই হাজার টন মাছ আহরণ করেন। এখানকার মোট আবাদি জমির ৫৮ শতাংশ এক ফসলি, ৩৯ শতাংশ দুই ফসলি এবং তিন শতাংশ তিন ফসলি। এই জনপদের প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ সরাসরি এবং আরও ১১ শতাংশ পরোক্ষভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। পুরো সিলেট জেলার ১৯টি চা-বাগানের মধ্যে ছয়টিই এই উপজেলায় অবস্থিত।
বর্তমানে খাসি ও বাঙালি মিলিয়ে এই জনপদে প্রায় পৌনে দুই লাখ মানুষের বসবাস, যার মধ্যে প্রায় ২৫ হাজার বাঙালি পরিবার রয়েছে। পাহাড়ের কোলে খাসিয়া সম্প্রদায়ের প্রায় সাড়ে ৩৫০টি পরিবার নিজস্ব সাংস্কৃতিক বলয় বা পুঞ্জিতে বাস করে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পরিচালিত এই জনগোষ্ঠীতে নারীরাই সব পারিবারিক ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। সপ্তাহের সোম থেকে শনিবার পর্যন্ত পুরুষেরা সুপারি বাগান থেকে লতানো পান পাতা সংগ্রহ করেন এবং নারীরা তা বাছাই করে ১৪৪টি পানে এক বিড়া বা মুঠা হিসেবে সাজিয়ে ১২০ টাকা দরে বাজারে বিক্রি করেন। মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীভুক্ত এই মানুষগুলো অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষারীতিতে কথা বললেও স্থানীয়দের সাথে স্বাভাবিক বাংলায় ভাব বিনিময় করেন এবং গান-বাজনায় অতিথি আপ্যায়ন করে থাকেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন