শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
সীমান্ত পর্যটন গাইড

কলমাকান্দা ভ্রমণ: পাঁচগাঁও ও পাহাড় দেখার পূর্ণাঙ্গ গাইড

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ০৮:০৬ পিএম

কলমাকান্দা ভ্রমণ: পাঁচগাঁও ও পাহাড় দেখার পূর্ণাঙ্গ গাইড

নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দা পাহাড়ি নদী, সবুজ বনভূমি ও শান্ত গ্রামীণ প্রকৃতির কারণে পর্যটকদের কাছে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার প্রতিটি পাহাড়ি বাঁক চোখ জুড়িয়ে দেয়। সীমান্ত ঘেঁষা পাঁচগাঁও গ্রামসহ চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়, শান্ত ঝিরিপথ ও আদিবাসী জনপদের সরল জীবনযাপন কলমাকান্দার প্রধান আকর্ষণ।

ঢাকা থেকে কলমাকান্দায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে ট্রেন ও বাস উভয় পথই ব্যবহার করা যায়। ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে নেত্রকোনাগামী ট্রেনের ভাড়া শ্রেণিভেদে ১৮০ টাকা থেকে ২১৫ টাকা। রাতের বেলায় রাত ১০টা ১৫ মিনিটের হাওর এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে ভোর ৪টার দিকে নেত্রকোনা স্টেশনে নামা সম্ভব। অন্যদিকে সড়কপথে যেতে চাইলে মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি কলমাকান্দাগামী বাসে ওঠা যায়, যেখানে জনপ্রতি ভাড়া ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা।

নেত্রকোনা স্টেশন থেকে ভোরে বের হয়ে অটোতে রাজুর বাজার যেতে জনপ্রতি ভাড়া লাগে ৩০ টাকা, আর রিকশায় গেলে খরচ হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা। রাজুর বাজার থেকে কলমাকান্দা সদরে পৌঁছানোর জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশায় জনপ্রতি ভাড়া ১২০ টাকা। একই পথে মোটরসাইকেলে গেলে দুজন যাত্রীসহ ভাড়া সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা পড়ে।

কলমাকান্দা বাজার থেকে স্থানীয় দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চেয়ে মোটরসাইকেল বেশি উপযোগী। দুর্গম পাহাড়ি পথ ও কাঁচা রাস্তায় সহজে যাতায়াত করতে পুরো দিনের জন্য একটি মোটরসাইকেল চালকসহ আনুমানিক এক হাজার ৩০০ টাকায় ভাড়া পাওয়া যায়। কলমাকান্দা সদরের কাছাকাছি সন্ন্যাসীপাড়া গ্রামে পৌঁছালে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রা ও খেতের পাশে মাছ ধরার দৃশ্য চোখে পড়ে। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং সেখান থেকে হেঁটে মাত্র পাঁচ মিনিটেই সীমান্ত এলাকায় যাওয়া সম্ভব।

সীমান্তের অন্যতম দর্শনীয় স্থান পাঁচগাঁওয়ের চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়। তবে পর্যটকদের জন্য এই এলাকায় সময় মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবির টহল দল মোতায়েন থাকে। সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার পর বিজিবির নিয়মিত টহল শুরু হলে সাধারণ পর্যটকদের পাহাড়ের খুব কাছে বা নোম্যান্স ল্যান্ডের দিকে যেতে দেওয়া হয় না। তাই চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড় ও সংলগ্ন পাহাড়ি ঝিরির সৌন্দর্য একদম কাছ থেকে দেখতে হলে একেবারে ভোরে পৌঁছাতে হয়। কোনো কারণে দেরিতে পৌঁছালে কলমাকান্দা বাজারের আবাসিক হোটেলে রাত যাপন করে পরদিন ভোরে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়টি ভৌগোলিকভাবে ভারতের মেঘালয় অংশে পড়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে থাকা আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার বাংলাদেশ ও ভারতকে আলাদা করেছে। পর্যটকদের নিরাপত্তাজনিত কারণে সীমান্ত রেখা অতিক্রম করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

পাঁচগাঁও গ্রামে রয়েছে এমপির বাড়ির বড় একটি পুকুর। এই পুকুরপাড়ে দাঁড়ালে কোনো প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ছাড়াই মেঘালয়ের সুউচ্চ সবুজ পাহাড়ের চমৎকার দৃশ্য উপভোগ করা যায়। পাঁচগাঁও গ্রামে মূলত গারো ও হাজং জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ধান, শাকসবজি ও নানা জাতের মৌসুমি ফসলের চাষাবাদের পাশাপাশি গবাদিপশু পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। ভারত থেকে বাংলাদেশে বয়ে আসা পাহাড়ি স্বচ্ছ ঝিরির পানি স্থানীয়রা দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার করে থাকেন।

পাঁচগাঁও পার হয়ে সীমান্ত সংলগ্ন বেদগড় গ্রামে পৌঁছালে আরও কাছে থেকে সবুজ পাহাড় দেখা যায়। তবে বেদগড়ের সীমানা ঘেঁষে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের ক্যাম্প ও সীমান্ত ফাঁড়ি রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে স্থানীয় বাংলাদেশি বসতবাড়ির সীমানার বাইরে পা বাড়ানো যাবে না।

এখান থেকে পাতলার বনে যেতে হলে খরস্রোতা মহাদেব নদী পার হতে হয়। স্থানীয় নৌকায় মহাদেব নদী পারাপারের জন্য জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয় ১০ টাকা এবং মোটরসাইকেল পারাপারে মোট ৩০ টাকা খরচ পড়ে। মহাদেব নদী পেরিয়ে পৌঁছানো যায় নয়নাভিরাম পাতলার বনে, যার চারপাশের বনাঞ্চল ও পাহাড়গুলো মেঘালয় অংশে অবস্থিত।

আরেকটি পরিচিত স্থান হলো গোপালবাড়ি গ্রামের পাশের বঙ্গটিলা। নোম্যান্স ল্যান্ডের কাছাকাছি অবস্থিত এই টিলায় একসময় অবাধে ওঠার সুযোগ থাকলেও বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে টিলার চূড়ায় ওঠা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত। টিলার শীর্ষ থেকে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া স্পষ্ট দেখা যায় বলে বিজিবি নিয়মিত এখানে নজরদারি চালায়।

দুপুরের খাবারের জন্য লেঙ্গুরা বাজার একটি সুবিধাজনক স্থান। লেঙ্গুরা বাজারের কাছেই অবস্থিত ঐতিহাসিক সাত শহীদের মাজার। ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হওয়া সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়েছে। মাজারের এক পাশে পাঁচজন এবং অন্য পাশে দুজনের সমাধি রয়েছে।

মাজারের ঠিক পাশেই অবস্থান করছে ঘন গাছপালা ও বনাঞ্চলে ঘেরা মমিনের টিলা। খাড়া পথ বেয়ে এই টিলার চূড়ায় উঠলে নিচের আঁকাবাঁকা মেঠোপথ এবং সীমান্তের ওপারের পাহাড়ের বিস্তৃত রূপ সরাসরি নজরে আসে।

কলমাকান্দার এই দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার পর পর্যাপ্ত সময় থাকলে পর্যটকেরা পাশের উপজেলা দুর্গাপুরে চলে যেতে পারেন। দুর্গাপুরের বিখ্যাত বিজয়পুর চিনামাটির পাহাড়ে সাদা, লালচে, হলুদ ও ধূসর রঙের মাটির স্তরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় বাড়তি মাত্রা যোগ করে।