রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

বাঁশের ভেলায় ১০ দিন ভেসে উত্তরবঙ্গ থেকে আটরশি যাত্রা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৯:৫৮ পিএম

বাঁশের ভেলায় ১০ দিন ভেসে উত্তরবঙ্গ থেকে আটরশি যাত্রা

কুড়িগ্রামের চিলমারী নদী বন্দরসহ উত্তরের বিভিন্ন অববাহিকা থেকে শত শত বিশাল বাঁশের ভেলা ভাসিয়ে ফরিদপুরের আটরশি দরবার শরীফের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন ভক্তরা। স্থানীয়ভাবে পরিচিত এই বাঁশের ভুরে চড়ে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মার বুক চিরে টানা সাত থেকে ১০ দিন বইঠা বেয়ে নদীপথ পাড়ি দিচ্ছেন তারা। আট থেকে ১০ দিনের এই দীর্ঘ পথচলায় নদীর বুকেই তাদের ভাসমান জীবন। ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব শুরু হয় আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে, ১৯৭৫ সালের দিকে। প্রতি বছর শীত মৌসুমে এই অঞ্চলের মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে প্রাকৃতিকভাবে একসঙ্গে বেঁধে বিশাল আকৃতির এই ভেলা তৈরি করেন। 

ভক্তরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে একটি-দুটি করে বাঁশ সংগ্রহ করেন, বাকিটা নিজেদের অর্থে কিনে নেন। একেকটি ভুরে ৮০০ থেকে এক হাজারটি পর্যন্ত বাঁশ থাকে। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর এসব বাঁশ দিয়ে আটরশিতে ওরশের বিশাল প্যান্ডেল ও অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ভুরিঙ্গামারীর পাগলারহাট থেকে আসা একটি ভুরে রয়েছেন অন্তত ৩০ জন মানুষ। প্রায় দুই মাস ধরে বাঁশ সংগ্রহ করে এক সপ্তাহে বাঁধা হয়েছে ভেলাটি। এই ভাসমান কাঠামোর ওপরেই অস্থায়ী ছাউনি বা ‍‍`ছুই‍‍` তৈরি করে রাত্রিযাপন করছেন যাত্রীরা। রয়েছে ভ্রাম্যমাণ বাথরুমের ব্যবস্থাও। রান্নার জন্য পর্যাপ্ত খড়ি, হাঁস-মুরগি ও মুড়িসহ বিভিন্ন শুকনা বাজার নিয়ে এই দীর্ঘ যাত্রায় নেমেছেন তারা। অনেক পরিবার মানত হিসেবেও হাঁস-মুরগি দিয়েছেন, যা যাত্রাপথে খাওয়া হয়।

সকালে মুড়ি আর চা দিয়ে নাস্তা সারার পর দুপুরে ও রাতে রান্না হয় গরুর মাংসের খিচুড়ি। রান্নার দায়িত্বে থাকা একজন জানান, সবার শারীরিক শক্তি অটুট রাখতে নিয়ম করে তিন বেলাই খাবারের আয়োজন থাকে। কারণ হাতের শক্তিতে এই বিশাল কাঠামোকে স্রোতের বিপরীতেও অনেক সময় ঠেলে নিতে হয়। টানা বইঠা চালাতে হয় আটজনকে। দুই পাশে চারজন করে বসে এই দায়িত্ব পালন করেন। ক্লান্তি এলে তাদের বদলে নতুন আটজন হাল ধরেন। যাত্রীদের সবার খরচ তারা নিজেরাই বহন করেন, এর জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেওয়া হয় না।

টানা ২০ বছর ধরে বাঁশের ভুরে আটরশিতে যাচ্ছেন এক প্রবীণ। তিনি জানান, আগে ধূমপান করতেন, নামাজ পড়তেন না; কিন্তু এই পথে এসে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ধরেছেন। আরেক ভক্ত জানান, ঢাকা থেকে কেবল ছুটি নিয়ে এই বাঁশের ভুরে যাওয়ার জন্য তিনি কুড়িগ্রামে এসেছেন। সবচেয়ে বড় পরীক্ষা দিতে হয় যমুনা আর পদ্মার বুকে।

উত্তাল পদ্মার বড় ঢেউ যখন বাঁশের কাঠামোতে আঘাত হানে, তখন বুক কেঁপে ওঠে যাত্রীদের। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে যা অসম্ভব মনে হয়, তীব্র বিশ্বাস আর টানে সেই ভয়াবহ স্রোত পাড়ি দিচ্ছেন তারা। হাতের বৈঠা আর স্রোতের অনুকূল ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে বিশাল এই ভেলাগুলো দিন-রাত এক করে এগিয়ে চলছে গন্তব্যের দিকে।