সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
পড়ালেখার পাশাপাশি উচ্চমূল্যের অপ্রচলিত ফসল বিটরুট চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন জয়পুরহাট সদর উপজেলার বড় মাঝিপাড়া গ্রামের তরুণ শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রুস্তম আলী স্বাধীন। স্নাতক শেষ বর্ষের এই শিক্ষার্থী দীর্ঘ ছয় বছর ধরে কৃষিকাজে যুক্ত থেকে নিজের আত্মকর্মসংস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় অনেকের আয়ের পথ তৈরি করেছেন। মৌসুমে কেবল বিটরুট বিক্রি করেই তিনি পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন।
রুস্তম আলীর বাবা একসময় কৃষিকাজ করতেন এবং বর্তমানে স্থানীয়ভাবে পল্লি চিকিৎসক হিসেবে সেবা দিচ্ছেন। ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি টান এবং পারিবারিক অনুপ্রেরণায় অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই কৃষির সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। শুরুর দিকে সহপাঠী ও পরিচিতদের নেতিবাচক মন্তব্য ও কটাক্ষ সহ্য করতে হলেও আধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের নতুন জাতের ফসল বেছে নিয়ে নিজের পথ তৈরি করেন। গত মৌসুমে বিটরুট চাষে দেশব্যাপী সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ পল্লি কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে সারা দেশের শীর্ষ দশজন কৃষকের তালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেন তিনি। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের কাছে পুষ্টিগুণে ভরপুর লাল রঙের এই মূলজাতীয় সবজির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সালাদ, তাজা জুস ও শুকনা গুঁড়া হিসেবে বিভিন্ন খাদ্য তৈরিতে বিটরুট ব্যবহৃত হয়। মাঠপর্যায়ে প্রতিটি উপযুক্ত বিটরুটের ওজন গড়ে তিনশত থেকে পাঁচশত গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।
উৎপাদন কৌশলের বিষয়ে রুস্তম আলী জানান, বাংলাদেশে এখনো বিটরুটের বীজ সরাসরি উৎপাদিত হয় না; ভারতীয় জাতসহ বিভিন্ন বিদেশি এফ ওয়ান হাইব্রিড জাতের বীজ ব্যবহার করতে হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাকস ফাউন্ডেশনের কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে তিনি এই উন্নত জাতের আবাদ করছেন। পূর্বের মৌসুমে মাত্র বারো শতক জমিতে এগারো হাজার টাকা খরচ করে চুরাশি হাজার টাকার বিটরুট বিক্রি করেছিলেন। চলমান মৌসুমে দেড় লাখ টাকা ব্যয়ে উৎপাদিত ফসল থেকে যাবতীয় খরচ বাদ দিয়ে অন্তত সাড়ে তিন লাখ টাকা নিট মুনাফার প্রত্যাশা করছেন তিনি।
বিটরুট মূলত নব্বই দিনের শীতকালীন একটি ফসল। জমি ফাঁকা থাকলে সরাসরি বীজ রোপণ করা যায়, তবে আগের ফসল মাঠে থাকলে বীজতলায় চারা উৎপাদন করে তা পরবর্তীতে মূল জমিতে স্থানান্তর করা সুবিধাজনক। পাঁচ থেকে ছয় সেন্টিমিটার উচ্চতার চারা আঠারো ইঞ্চি দূরত্বে তিনটি করে শাড়িবদ্ধভাবে রোপণ করা আদর্শ নিয়ম। চারা রোপণের পূর্বে জমিতে আগাম সেচ দিলে প্রতিটি গাছের গোড়ায় আলাদা পানি দেওয়ার বাড়তি খরচ বাঁচে। পুরো মেয়াদের মধ্যে মাটিতে রসের অবস্থা বুঝে মোট চারটি সেচ দিতে হয়। মাটির নিচে খাদ্য উপাদান সরবরাহে জৈব সার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যেখানে প্রতি শতকে চার থেকে পাঁচ বস্তা গোবর সার এবং প্রয়োজনমতো ডিএপি, ইউরিয়া, টিএসপি, বোরন ও ম্যাগনেসিয়াম প্রয়োগ করতে হয়। জমিতে ছত্রাক বা অন্যান্য রোগজীবাণু ধ্বংস করতে চাষের পর কয়েক দিন জমিতে কড়া রোদ লাগানো এবং শতকপ্রতি দুই কেজি হারে চুন প্রয়োগ কার্যকর ফল দেয়।
কাঁচা সবজির পাশাপাশি বিটরুটের প্রক্রিয়াজাতকরণে অভাবনীয় লাভ তুলে নিচ্ছেন এই তরুণ। কাঁচা বিটরুট পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি আশি থেকে পঁচানব্বই টাকা এবং খুচরা বাজারে একশত চল্লিশ থেকে একশত পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি হয়। তবে উন্নত স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে বিটরুট পাতলা করে কেটে রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে পাউডার তৈরি করলে মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। প্রতি পাঁচ কেজি কাঁচা বিটরুট প্রক্রিয়াজাত করে এক কেজি পাউডার উৎপাদন সম্ভব, যার বাজারদর দুই হাজার থেকে তিন হাজার টাকা। বাতাস থেকে দ্রুত আর্দ্রতা শোষণ করে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় এই শুকনা পাউডার ফয়েল প্যাকেটে সংরক্ষণ করতে হয়, যার স্থায়িত্ব থাকে অন্তত ছয় মাস। প্রক্রিয়াজাতকরণের এই কাজে আরও দশ থেকে পনেরো জন মানুষের মৌসুমি কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিটরুটের বাইরে ব্ল্যাক ফিলিপাইন জাতের আখ, বস্তায় আদা চাষ, সাথী ফসল হিসেবে পেঁপে এবং জি-নাইন টিস্যু কালচার কলার সফল বাণিজ্যিক চাষ করছেন রুস্তম আলী। তেইশ বছর বয়সেই কৃষির উপার্জন দিয়ে নিজস্ব নতুন বাড়ি নির্মাণ করে গ্রামীণ তরুণদের জন্য আত্মনির্ভরতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন