সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬, ০৯:১৯ পিএম
প্রচলিত জাতের স্বল্প ফলন এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রতিকূলতা কাটিয়ে বারোমাসি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড সবজি চাষে লাভবান হচ্ছেন দেশের কৃষকেরা। বিশেষ করে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড লাউ, ছোট আকারের মিষ্টি কুমড়া এবং আকর্ষণীয় বেগুনের উন্নত জাত মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ও মুনাফা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
এসিআই প্লান্ট জেনেটিক্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে সবজির নতুন জাত উদ্ভাবন নিয়ে বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। অতীতে সনাতন পদ্ধতিতে দেশীয় জাতের বীজ সংরক্ষণ করে লাউ চাষ করা হলেও গাছে ফলন হতো অত্যন্ত সীমিত। সেই সীমাবদ্ধতা দূর করতে দুটি পৃথক গুণসম্পন্ন পুরুষ ও স্ত্রী গাছের পরাগায়নের মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয়েছে উন্নত হাইব্রিড জাত।
গবেষক দল জানিয়েছেন, লাউ চাষে প্রধান অন্তরায় হলো কান্ড ফেটে আঠা বের হওয়া রোগ বা গামি স্টেম ব্লাইট এবং ফিউজেরিয়াম উইল্ট, যাতে গাছ দ্রুত মরে গিয়ে ফলন মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর পাশাপাশি তীব্র তাপমাত্রায় রোগবালাই বেড়ে যাওয়া এবং তীব্র শীতে মৌমাছি পরাগায়ন না করায় ফলন বিপর্যয় ঘটে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় মলিকিউলার ব্রিডিং, জিনোম এডিটিং, মার্কার অ্যাসিস্টেড সিলেকশন ও ডাবল হ্যাপ্লয়েডি প্রযুক্তির মাধ্যমে রোগবালাই ও তাপমাত্রা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। এমনকি দীর্ঘ আলোককালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে যখন পুরুষ ফুল বেশি ও স্ত্রী ফুল কম ফোটে, সেই সময়ের জন্যও উপযোগী জাত তৈরির কাজ চলছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির উদ্ভিজ্জ প্রজনন কার্যক্রমের আওতায় বারোটি ফসলের প্রায় ৩৯টি হাইব্রিড জাত কৃষকের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে লাউ, করলা, ঝিঙ্গা, ধুন্দুল, শসা ও মিষ্টি কুমড়ার মতো সবজি রয়েছে। দেশে লাউয়ের আনুমানিক ২৫ কোটি টাকার বাজারে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ শেয়ার তৈরি হয়েছে এই উদ্ভাবিত জাতগুলোর মাধ্যমে, যার ফলে একসময়ের সম্পূর্ণ আমদানি-নির্ভরতা কাটিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে জাত উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চলে থাকা ছয়টি বিশেষ পরীক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে জাতগুলোর তুলনামূলক উৎপাদন ক্ষমতা যাচাই করে চূড়ান্ত জাত বাজারে সরবরাহ করা হয়।
মাঠপর্যায়ে গবেষণার ফলাফল দেখতে এসে চাষিরা জানান, ময়না জাতের লাউ আগাম ও নাবি উভয় মৌসুমেই অত্যন্ত লাভজনক। চাষিদের তথ্যমতে, এক বিঘা জমিতে লাউ চাষ করতে খরচ হয় প্রায় ৫০ হাজার টাকা এবং উৎপাদিত ফসল বিক্রি করে আয় হয় প্রায় দেড় লাখ টাকা। মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে আগাম ফলন পাওয়া যায়।
অপরদিকে আধুনিক একক পরিবারের চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে দুই থেকে তিন কেজি ওজনের ছোট মিষ্টি কুমড়া উদ্ভাবনে জোর দেওয়া হচ্ছে। বাজারে বর্তমানে বড় মিষ্টি কুমড়ার পাশাপাশি সুইট বয়, সুইট বেবি, সুইট ডায়মন্ড, সুইট স্পট ও মোহনা নামের বিভিন্ন জাত রয়েছে। বড় মিষ্টি কুমড়ার দাম বেশি হওয়ায় এবং কাটার পর দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় মধ্যবিত্ত ও ছোট পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী আকারের নতুন জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে।
একইভাবে পার্পল স্টার জাতের হাইব্রিড বেগুন চাষ করেও দৃষ্টান্তমূলক লাভ করছেন কৃষকেরা। স্থানীয় কৃষক কফিল উদ্দিন জানান, আকর্ষণীয় চকচকে রং, বীজহীন নরম শাঁস ও পাতলা চামড়ার কারণে বাজারে সাধারণ বেগুনের চেয়ে এই জাতটি কেজিতে অন্তত ১০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়। মাত্র ৩০ হাজার টাকা পরিচর্যা খরচ ও ১০ হাজার টাকার বার্ষিক জমি ভাড়ায় আবাদ করে আড়াই মাসেই তিনি প্রায় ৮০ হাজার টাকার বেগুন বিক্রি করেছেন। পরবর্তী তিন মাস মিলিয়ে মোট বিক্রির অঙ্ক এক লাখ ৮০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি। রোগসহনশীল ও অধিক ফলনশীল এসব হাইব্রিড জাত গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে শক্তিশালী পরিবর্তন নিয়ে আসছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন