বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
সফল কৃষি উদ্যোগ

খরগোশ পালনে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার শরিফুলের বাজিমাত

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

খরগোশ পালনে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার শরিফুলের বাজিমাত

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পেশা ছেড়ে বিদেশি উন্নত জাতের শৌখিন খরগোশ লালন-পালন করে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন খামারি শরিফুল।

করোনাভাইরাস মহামারির পরপরই তিনি এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ শুরু করেন এবং বিগত পাঁচ বছর ধরে এটিকেই সার্বক্ষণিক পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে পরিবার নিয়ে সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করছেন। তার খামারে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা জোড়া মূল্যের বিদেশি জাতের খরগোশ রয়েছে। পোষাপ্রাণীর বাজারে উন্নত বংশমর্যাদা ও মানসম্মত গঠনের কারণে এসব খরগোশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

একটি মানবিক অভিজ্ঞতা থেকে এই খামারের মূল অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। শরিফুল অতীতে একটি গণমাধ্যমে কাজের সূত্রে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সান্নিধ্যে আসেন, যিনি দরিদ্র ও ভিক্ষুকদের স্বাবলম্বী করতে খরগোশ বিতরণের একটি মানবিক প্রকল্প পরিচালনা করতেন। সেই ভাবনা শরিফুলের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। তিনি ২০০৫ সাল থেকে খরগোশ পালনের জীববৈজ্ঞানিক দিক নিয়ে দীর্ঘ তাত্ত্বিক পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালের দিকে সরাসরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে নামেন। তিনি রোগের উপসর্গ নিরাময়ের চেয়ে রোগ সৃষ্টির মূল বৈজ্ঞানিক কারণ উদঘাটনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। খরগোশের প্রজনন ও সুস্থতা প্রসঙ্গে প্রচলিত ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট করেন তিনি। যদিও একটি খরগোশ প্রতি মাসেই বাচ্চা দিতে শারীরিকভাবে সক্ষম, তবুও বাণিজ্যিক খামারে দীর্ঘমেয়াদে মান ধরে রাখতে সঠিক বিরতি প্রয়োজন। একটি বাচ্চাকে অন্তত ৪৫ দিন পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগে মাকে আলাদা করে ফেললে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে এবং রক্তক্ষরণ বা খিঁচুনি হয়ে অল্প বয়সেই বাচ্চার মৃত্যু ঘটে।

শরিফুলের খামারে মোট নয়টি উন্নত বিদেশি জাতের খরগোশ সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি জাত হলো সিংহসদৃশ গড়নের লায়ন লপ। রয়েছে ছোট কান ও গোলাকার মুখের লোমশ ফুজি ডর্ফ, যার তিন মাস বয়সী এক জোড়া বাচ্চার দাম ২৫ হাজার টাকা। এগুলো অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এবং নরম তুলতুলে লোমের কারণে গৃহপালিত হিসেবে দারুণ সমাদৃত। এর পাশাপাশি রয়েছে জার্মানির মূল জাত হট ডর্ফ, যা শব্দের সংকেত ও মালিকের কণ্ঠ মনে রাখার অনন্য ক্ষমতার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দেশে এই হট ডর্ফ জাতের এক জোড়া খরগোশের দাম সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে। খরগোশের গলা ও চিবুকের নিচে বিশেষ ভাঁজ বা কার্ভ দেখে এর শতকরা একশত ভাগ শারীরিক সুস্থতা যাচাই করা যায়। খামারে রয়েছে ঘন পশমের জন্য পরিচিত তুরস্কের মূল জাত জায়ান্ট অ্যাঙ্গোরা। পুরো মুখমণ্ডল ঘন পশমে আবৃত থাকায় বাইরে থেকে এদের চোখ সহজে দেখা যায় না। এই জাতের খরগোশ অত্যন্ত ঘ্রাণপ্রিয় এবং মালিকের শরীরের গন্ধ চিনে কাছে চলে আসে। বর্তমানে খামারে থাকা প্রায় ৭০টি খরগোশের প্রত্যেকের নিজস্ব নাম নথিভুক্ত রয়েছে।

আরেকটি জনপ্রিয় ছোট জাত হলো নেদারল্যান্ডস ডর্ফ। প্রাকৃতিকভাবে খরগোশ মাটির নিচে গর্ত খুঁড়ে বাচ্চা প্রসব করে বলে খামারে এদের জন্য কৃত্রিম কাঠের বাক্স তৈরি করে দেওয়া হয়। এরা অত্যন্ত পরিচ্ছন্নতাপ্রেমী এবং অম্লীয় পরিবেশ বা অ্যামোনিয়ার গন্ধ এড়াতে এক জায়গায় প্রস্রাব ও অন্য জায়গায় মলত্যাগ করার সহজাত অভ্যাস বজায় রাখে। গৃহে পালনের ক্ষেত্রে স্থান নির্দিষ্ট করতে ভিনেগার মেশানো পানির সাহায্য নিয়ে সহজেই এদের অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা যায়। সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ দিন বয়সের মধ্যে নেদারল্যান্ডস ডর্ফের এক জোড়া বাচ্চা ২৫ হাজার টাকায় হস্তান্তর করা হয়। শরিফুলের খামারে ৭০টি প্রজননক্ষম মাদী খরগোশসহ মোট প্রায় ৯০টি খরগোশ রয়েছে। একটি খরগোশ একবারে ১টি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৮টি পর্যন্ত বাচ্চা প্রসব করতে পারলেও তিনি বছরে মাত্র দুইবার প্রজনন করান। অতিরিক্ত প্রজনন এড়িয়ে মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করায় প্রতিটি ধাপে প্রায় তিন শতাধিক সুস্থ বাচ্চা উৎপাদিত হয়। কৃমি ও খোসপাঁচড়া প্রতিরোধে ঘাস খাওয়ানোর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে প্রতি তিন মাস পর পর নিয়মমাফিক কৃমিনাশক ও বিশেষ টিকা প্রয়োগ করা হয়। মৌসুমি কারণে স্বাভাবিক নিয়মে বছরে তিনবার এদের লোম ঝরে নতুন পশম গজায়।

বিজ্ঞানসম্মত যত্ন, সঠিক ডায়েট ও নিয়ন্ত্রিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে পারলে শৌখিন খরগোশের খামার অত্যন্ত আধুনিক ও লাভজনক একটি উদ্যোগ হতে পারে বলে প্রমাণ করেছেন এই প্রকৌশলী।