রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

বরিশালের সাতলা বিল: লাল শাপলার স্বর্গরাজ্যে যাওয়ার উপায়

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম

বরিশালের সাতলা বিল: লাল শাপলার স্বর্গরাজ্যে যাওয়ার উপায়

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা ইউনিয়নের উত্তর সাতলা গ্রামে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ এক জলাভূমি, যা স্থানীয়ভাবে সাতলার শাপলা বিল নামে সর্বাধিক পরিচিত। জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এখানে লাল শাপলার সবচেয়ে বেশি সমারোহ থাকে। এ সময় জলরাশির বুকে ফুটে থাকা অগণিত লাল শাপলার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। বরিশাল সদর থেকে এই বিলটির দূরত্ব প্রায় ৬৭ কিলোমিটার।

দর্শনার্থীদের যাতায়াতের জন্য সুনির্দিষ্ট পথ রয়েছে। বরিশাল থেকে প্রথমে বাসে চড়ে উজিরপুরের নতুনহাট বাস টার্মিনাল বা শিকারপুর পর্যন্ত আসতে হয়। সেখান থেকে অটোরিকশায় চড়ে সরাসরি সাতলা শাপলা বিলে পৌঁছানো যায়। বিলে নেমে খুব কাছ থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য ঘণ্টা চুক্তিতে স্থানীয় মাঝিদের নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। সাধারণত ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে এই ভাড়া নির্ধারিত হয়, তবে পর্যটকদের তা দরদাম করে ঠিক করে নিতে হয়। প্রাকৃতিক এই সৌন্দর্য পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে।

বরিশাল শহর থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক নারী পর্যটক জানান, বর্ষাকালে প্রতি বছরই তিনি এই বিলে আসেন। তবে তিনি এলাকার অবকাঠামোগত কিছু ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যাতায়াতের রাস্তা আরও ভালো হলে এবং আশেপাশে থাকার হোটেল ও মানসম্মত খাবারের সুবিধা থাকলে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বাড়ত। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি। মাথাভর্তি লাল শাপলার তৈরি মুকুট পরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে এই দর্শনার্থী জানান, নিজেকে তার শাপলার রানির মতো মনে হচ্ছিল এবং এই ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর সাড়া ফেলবে বলে তিনি আশাবাদী।

শুধু সৌন্দর্যের জন্যই নয়, লাল শাপলার পুষ্টিগুণও অপরিসীম। সাধারণ শাপলার বৈজ্ঞানিক নাম ‍‍`নিমফিয়া পিউবেসেন্স‍‍` হলেও এই লাল শাপলার বৈজ্ঞানিক নাম ‍‍`নিমফিয়া রুব্রা‍‍`। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে খনিজ, ভিটামিন, আঁশ, ক্যালরি, ক্যালসিয়াম, শর্করা এবং ফসফরাস। এই পুষ্টি উপাদানগুলো মানবদেহে ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। স্থানীয় অধিবাসীরা দৈনন্দিন রান্নায় সবজি হিসেবে লাউয়ের পাশাপাশি শাপলার ডাঁটাও ব্যবহার করেন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, চীন, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় এই শাপলা প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে।

পর্যটকদের পাশাপাশি বিলটি স্থানীয় বাসিন্দাদের আয়ের অন্যতম একটি উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝিরা যেমন নৌকা চালিয়ে উপার্জন করেন, তেমনি স্থানীয়দের অনেকেই শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এছাড়া গ্রামে ফেরি করে নানা পদের মুখরোচক খাবার ও তৈজসপত্র বিক্রির চল রয়েছে। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পেশাই কৃষি ও মৎস্য শিকারের ওপর নির্ভরশীল। কেউ কেউ আবার দিঘির পাড়ে মুরগির খামার গড়ে তুলেছেন, যার বিষ্ঠা একই সঙ্গে পুকুরের মাছের খাদ্যসংস্থান করছে।

এলাকাটির শিক্ষাদীক্ষা ও জনসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান রয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী সাতলা ইউনিয়নের মোট জনসংখ্যা ছিল ২৭ হাজার ৭৩ জন এবং পরিবারের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৭৬৮টি। এই ইউনিয়নে শিক্ষার হার প্রায় ৯০ শতাংশ। এখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে চারটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দুটি কলেজ। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য দুটি দাখিল, তিনটি কওমি, পাঁচটি হাফিজি ও আটটি নূরানি মাদ্রাসার পাশাপাশি শিশুদের জন্য চারটি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সমন্বয়ে এই শাপলা বিলটি সাতলাবাসীর জন্য একটি দারুণ আশীর্বাদে পরিণত হয়েছে।