শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
উচ্চশিক্ষায় সংস্কার

উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক মূল্যায়ন কাঠামোর সুপারিশ

রাকিবুল হাসান মুন্না

সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম

উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষক মূল্যায়ন কাঠামোর সুপারিশ

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের মেধা ও অ্যাকাডেমিক অগ্রগতি প্রতিটি ধাপে কঠোরভাবে যাচাই করা হলেও পাঠদানকারী শিক্ষকদের দক্ষতার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন হয় না। একজন শিক্ষার্থীকে নিয়মিত উপস্থিতি, ধারাবাহিক অ্যাসাইনমেন্ট, মিডটার্ম ও সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার কঠিন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। অথচ শ্রেণিকক্ষে যিনি জ্ঞানের মূল বিতরণ করছেন, সেই শিক্ষকের পাঠদানের স্পষ্টতা, বিষয়বস্তু উপস্থাপনের প্রাসঙ্গিকতা কিংবা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার গুণগত মান যাচাইয়ের কোনো স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। 

এই বৈপরীত্য দূর করে শিক্ষার প্রকৃত মান নিশ্চিত করতে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের জোরালো দাবি হয়ে উঠেছে। শিক্ষাদানের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। একটি আধুনিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় কেবল উচ্চতর ডিগ্রির সনদ ভালো শিক্ষাদানের একমাত্র নিশ্চয়তা হতে পারে না। শিক্ষক নির্ধারিত পাঠ্যসূচি সময়মতো শেষ করছেন কি না, তাত্ত্বিক জটিল বিষয়গুলোকে শিক্ষার্থীদের বোধগম্য ভাষায় উপস্থাপন করতে পারছেন কি না এবং শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিচ্ছেন কি না, তা যাচাই করা আবশ্যক। 

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষের প্রতি শিক্ষার্থীদের অসন্তোষের অন্যতম বড় কারণ মূল বিষয়ের বাইরে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনা করা এবং পাঠ্যসূচির গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়া। প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নের অনুপস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষাদান ব্যাহত করে বাইরের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিগত ব্যবসায় সময় দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। তবে কেবল শিক্ষার্থীদের একক মতামতের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষকের মূল্যায়ন পরিচালনা করলে ব্যক্তিভিত্তিক পক্ষপাত ও আবেগজনিত জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে একটি বৈজ্ঞানিক ও বহুস্তরভিত্তিক মূল্যায়ন মডেল গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের চিকিৎসা ও প্রকৌশল শিক্ষার মতো পেশাগত ক্ষেত্রের প্রায় ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষক এই মূল্যায়নের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁরা একক শিক্ষার্থীর মূল্যায়নের পরিবর্তে শিক্ষার্থী, প্রশিক্ষিত নিরপেক্ষ মূল্যায়ক, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, শিক্ষকের আত্ম-মূল্যায়ন এবং সহকর্মীদের পর্যালোচনার একটি সমন্বিত কাঠামোর পক্ষে অবস্থান জানিয়েছেন।

উচ্চশিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণার আলোকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আনুপাতিক মডেল বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রস্তাবিত এই মডেলে ৫০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা যেতে পারে শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ গোপনীয় মতামতের ওপর, যা লাইকার্ট স্কেলে পরিমাপ করা হবে। বাকি ৫০ শতাংশের মধ্যে ২০ শতাংশ সহকর্মী ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের পর্যালোচনায়, ১৫ শতাংশ বিভাগীয় প্রধান বা নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের ক্লাসরুম পরিদর্শনে এবং অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ শিক্ষকের গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবদানের ওপর নির্ধারণ করা সম্ভব।

শিক্ষক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কোনো নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা না নিয়ে জাতীয় সহায়ক কাঠামো প্রণয়ন করতে পারে। কমিশনের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স সেল বা আইকিউএসিকে সক্রিয় করে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রেখেই এই নীতিমালা কার্যকর করা যায়। ডিজিটাল যুগে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ও কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণ সহজ হলেও, তা যেন কোনোভাবেই শিক্ষকদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা ও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার ওপর প্রশাসনিক নজরদারিতে রূপ না নেয়।

মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশের হাতিয়ার হওয়া থেকে কঠোরভাবে রক্ষা করা জরুরি। রেটিংকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে কোনো শিক্ষককে ট্রোলিংয়ের শিকার করা যাবে না এবং মূল্যায়নের ফলাফল কেবল সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রশাসনের নথিতে সংরক্ষিত থাকতে হবে। কোনো শিক্ষক প্রত্যাশিত মানের নিচে স্কোর পেলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে শাস্তির আওতায় না এনে আইকিউএসির মাধ্যমে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া উচিত। শিক্ষা ও গবেষণার বৈশ্বিক মানে পৌঁছাতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ ও গঠনমূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি বাস্তবায়নই উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারে।