বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
দুদক অনুসন্ধান

আসিফ মাহমুদের সম্পদ ও অর্থপাচার অনুসন্ধানে বিএফআইইউকে চিঠি

জাতীয় ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম

আসিফ মাহমুদের সম্পদ ও অর্থপাচার অনুসন্ধানে বিএফআইইউকে চিঠি

সংগৃহীত ছবি

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তার স্ত্রীর দেশি-বিদেশি যাবতীয় আর্থিক লেনদেন ও সম্পদের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কমিশনের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা এই চিঠির মাধ্যমে পাঁচটি নির্দিষ্ট দেশে অর্থপাচার, জমি ক্রয় ও শেল কোম্পানি গঠনের বিষয়ে বিস্তারিত রেকর্ড তলব করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্রে এই পদক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান দল তদন্তের পরিধি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিস্তৃত করেছে।

কমিশনের পাঠানো চিঠিতে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সচল, সুপ্ত বা বন্ধ সব ধরনের হিসাবের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ চাওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন, ব্যাংক লকার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, মেয়াদি আমানত, ডিপিএস এবং গৃহীত ঋণের নথি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়। একই সঙ্গে পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে কোনো জমি ক্রয়, অর্থপাচার কিংবা অস্তিত্বহীন শেল কোম্পানি খোলা হয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে তথ্য পাঠাতে বলা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন, বিদেশে অর্থ হস্তান্তর এবং বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধানে বিশ্বের পাঁচটি দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সাবেক এই উপদেষ্টার দুই ভগ্নিপতি ও এক ভাগ্নেকে ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে দুবাইয়ে চার হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাঠিয়ে বিলাসবহুল ভিলা ক্রয় এবং ‘গ্রীন গ্রুপ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে মূলধন সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সিঙ্গাপুরে তিন হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় দুই হাজার কোটি, সুইজারল্যান্ডে দেড় হাজার কোটি টাকা পাঠানো এবং দুর্নীতির অর্থে পর্তুগালে জমি কেনার অভিযোগের নথিপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।

প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রেও ঘুষ ও আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ যুক্ত হয়েছে এই অনুসন্ধানে।

নতুন অভিযোগের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬টি জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়নের ক্ষেত্রে দুই থেকে ১০ কোটি টাকা করে লেনদেন হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখছে কমিশন। এ ছাড়া সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপ, গ্রামীণ সেতু নির্মাণ এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে এক হাজার ২০০ কোটি টাকার অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

নিয়োগ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগের জন্য ১০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী পদে ৫২ কোটি এবং গাজীপুর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগে ৬৫ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণের পৃথক অভিযোগ রয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে মুরাদনগর উপজেলার জন্য বরাদ্দকৃত ৪৫৩ কোটি টাকার ব্যবহার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদার সিন্ডিকেট ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহ করতেন তার পিতা বিল্লাল হোসেন এবং ব্যক্তিগত সহকারী মোয়াজ্জেম হোসেন ও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়া।

তদন্তের জালে সাবেক এই উপদেষ্টা ছাড়াও যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, যুগ্ম সচিব ড. শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদসহ প্রায় এক ডজন কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটা ও বদলিতে অনিয়মের তথ্যানুসন্ধানে নেমে চার ধরনের নথি তলব করে দুদক, যা ইতিমধ্যে কমিশনে এসে পৌঁছেছে। ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন ও পদায়ন বাণিজ্যের নতুন অভিযোগগুলো কমিশনের পূর্ববর্তী অনুসন্ধানের সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা হয়।

এর আগে দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক তথ্যের বিষয়ে দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তার দেওয়া বক্তব্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মানহানির অভিযোগ তুলেছিলেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গত ১০ সেপ্টেম্বর কমিশনের ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে একটি আইনি নোটিশও পাঠানো হয়। তবে ৯ সেপ্টেম্বর কমিশন সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছিলেন যে আইন ও প্রতিষ্ঠিত বিধি মেনেই এই অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।