মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

জীবন দিলেও যদি চরিত্র না বদলায়, ভাগ্যও বদলাবে না : ফয়জুল করীম

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৭:৪৫ পিএম

জীবন দিলেও যদি চরিত্র না বদলায়, ভাগ্যও বদলাবে না : ফয়জুল করীম

ছবি - সংগৃহীত

দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কেন আসছে না, সেই মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তিনি বলেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তন করলেই হবে না, দেশের মানুষের ভাগ্য বদলাতে হলে আগে নিজেদের চরিত্র বদলাতে হবে।

তিনি মনে করেন, মানুষের ভেতরের নৈতিকতার পরিবর্তন না ঘটলে, জীবন দিয়ে দিলেও ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন আসবে না। বৃহস্পতিবার বিকেলে কুমিল্লা নগরীর কচুয়া চৌমুহনীতে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কঠোর আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানান। তার এই বক্তব্য জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যে এক নতুন নৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।

মুফতি ফয়জুল করীম তার বক্তব্যে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে একটি বড় পরিবর্তন এলেও এক বছর পার না হতেই দেশে আবারও সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মতো পুরোনো অপরাধগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কিসের পরিবর্তন হলো? কেন আমরা বারবার হোঁচট খাচ্ছি এবং ব্যর্থ হচ্ছি, কিন্তু অতীতের ভুল থেকে কোনো শিক্ষা নিচ্ছি না?

তিনি সাধারণ মানুষের বোধশক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, একটা গরুও যদি একবার ‘চিটা’ খায়, সে দ্বিতীয়বার আর তা খায় না। অথচ মানুষ হিসেবে আমরা সেই গরুর চেয়েও অধম হয়ে গেছি, কারণ আমরা বারবার একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করি। তার এই কঠোর মন্তব্য উপস্থিত জনতাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।

ইসলামী আন্দোলনের এই শীর্ষ নেতা সমাজে অন্যায় ও দুর্নীতি টিকে থাকার জন্য কেবল নেতাদের দোষারোপ না করে, সাধারণ জনগণের দায়বদ্ধতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বলেন, যখন কোনো নেতা অন্যায় করে, দুর্নীতি করে জেলে যান, তখন তিনি জেল থেকে বের হলে আমরাই তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করি। তিনি বলেন, কাউকে ফুল দেওয়া অন্যায় নয়, কিন্তু একজন অন্যায়কারীকে সম্মান দেখানোটা অন্যায়। এই সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই আমরা সমাজে অন্যায়কে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করি এবং তাকে টিকিয়ে রাখি।

ফয়জুল করীম আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, আমি মনে করি, সব দোষ আসলে জনগণের। যদি দেশের সাধারণ জনগণ দৃঢ়ভাবে ঘুষ প্রত্যাখ্যান করত, দুর্নীতিকে ঘৃণা করত, তাহলে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাই দুর্নীতি করার সাহস পেত না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণ আন্তরিকভাবে চাইলেই কেবল দেশে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আসন্ন নির্বাচন এবং ভোটের পবিত্রতা নিয়েও কথা বলেন মুফতি ফয়জুল করীম। তিনি ভোটারদের সতর্ক করে বলেন, ভোটের সময় অসাধু নেতারা টাকার বস্তা নিয়ে আসবে। তখন যদি তোমরা নিজেদের গরু-ছাগলের মতো বিক্রি করে দাও, তাহলে অন্তত চেষ্টা করো ভালো দামে বিক্রি হতে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, যারা সত্যিকার অর্থে মানুষ, যাদের আত্মসম্মানবোধ আছে, তারা কখনোই সামান্য টাকার বিনিময়ে নিজেদের মূল্যবান ভোট বিক্রি করে না।

তিনি বলেন, মনে রেখো, তোমার একটি ভোট মানে শুধু একজন প্রতিনিধি নির্বাচন নয়, এটি তোমার নিজের ভবিষ্যৎ, তোমার সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনও তোমাদের হাতেই নির্ভর করছে। জনগণ যদি চায়, তবে এই শাসন ব্যবস্থাও পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন শুরু করতে হবে আগে নিজের ভেতর থেকে, নিজের নৈতিক অবস্থান থেকে।ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কুমিল্লা মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত এই সমাবেশটি মূলত ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং খুনিদের দৃশ্যমান বিচারের’ দাবিতে অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব প্রকৌশলী আশরাফুল আলম, সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমাদ আব্দুল কাইয়ুম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কুমিল্লা মহানগরের প্রধান উপদেষ্টা কামরুল হাসান খান (খোকন) এবং কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনে দলটির ঘোষিত সম্ভাব্য সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কুমিল্লা মহানগরের সভাপতি এম এম বিলাল হোসাইন। সমাবেশ শেষে দেশ, জাতি এবং মুসলিম উম্মাহর সার্বিক কল্যাণ কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়। মুফতি ফয়জুল করীমের এই আত্মসমালোচনা ও নৈতিক পুনর্জাগরণের আহ্বান বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নতুন চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।