সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ ও বৈধ কাজের মধ্যেও ভারসাম্য ও পরিমিতিবোধ বজায় রাখার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে ইসলামে। কোনো কাজের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি মানুষের আত্মিক ক্ষতি ডেকে আনতে পারে এবং তাকে নানা অপছন্দনীয় কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলে। হাদিসের দিকনির্দেশনা পর্যালোচনা করলে এমন অন্তত দশটি কাজের সন্ধান পাওয়া যায়, যা সীমা অতিক্রম করে অতিরিক্ত মাত্রায় করতে নিরুৎসাহিত করেছেন মহানবী (সা.)। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনেই মানুষের আত্মিক মুক্তি নিশ্চিত হয়।
প্রথমত, অতিরিক্ত মাত্রায় হাসতে নিষেধ করা হয়েছে। হাসা বৈধ হলেও তা যেন অতিরিক্ত হাসাহাসি বা সর্বদা হাসি-ঠাট্টায় রূপ না নেয়। ইবনে মাজাহর চার হাজার ১৯৩ নম্বর হাদিসে মহানবী (সা.) উল্লেখ করেছেন, অতিরিক্ত হাসি মানুষের অন্তরকে মৃত করে দেয় এবং মানুষকে পরকালের চিন্তা থেকে উদাসীন রাখে। এমনকি মানুষকে কেবল হাসানোর জন্য যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয়, তিরমিজি শরিফের দুই হাজার ৩১৫ নম্বর হাদিস অনুযায়ী তাদের জন্য ধ্বংসের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক বেচাকেনায় অতিরিক্ত শপথ করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। মুসলিম শরিফের এক হাজার ৬০৭ ও নাসাঈর চার হাজার ৪৬০ নম্বর হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, অনবরত শপথ হয়তো সাময়িকভাবে পণ্যের বিক্রি বাড়াতে পারে, কিন্তু তা বাণিজ্যের যাবতীয় বরকত নষ্ট করে দেয় এবং ক্রেতার আস্থা বিনষ্ট করে।
তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত প্রশ্ন করার অভ্যাস পরিহার করার তাগিদ রয়েছে। বুখারি শরিফের এক হাজার ৪১৭ নম্বর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, অনর্থক পরচর্চামূলক কথাবার্তা, সম্পদের অপচয় এবং মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্ন করাকে আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন। মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে অযথা নাক গলানো বা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সম্পর্কহীন কাল্পনিক বিষয়ে বারবার প্রশ্ন করা এর অন্তর্ভুক্ত।
চতুর্থত, অতিরিক্ত উপদেশ বা নসিহত দিতেও নিষেধ করা হয়েছে। বুখারি শরিফের ৭০ নম্বর হাদিস থেকে জানা যায়, সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) জানিয়েছেন, সাহাবিরা যাতে বিরক্ত ও ক্লান্ত না হয়ে পড়েন, সে জন্য মহানবী (সা.) তাঁদের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিরতি দিয়ে নসিহত করতেন।
পঞ্চমত, পবিত্র কাবা শরিফ তাওয়াফের সময় অতিরিক্ত কথাবার্তা বলতে বারণ করা হয়েছে। নাসাঈর দুই হাজার ৯২২ নম্বর হাদিস অনুযায়ী, তাওয়াফ হলো নামাজের সমতুল্য একটি বিশেষ ইবাদত, তাই এ সময় অপ্রয়োজনীয় কথা কম বলা কাম্য। অন্যথায় আল্লাহর দরবারে একান্ত বিনয় ও দোয়া থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়।
ষষ্ঠত, রাত গভীর হওয়ার পর অকারণে বাইরে চলাফেরা কমিয়ে আনার নির্দেশ এসেছে। আবু দাউদের পাঁচ হাজার ১০৪ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, রাত বেশি হওয়ার পর বাইরে বের হওয়া কমাতে, কারণ ওই সময়ে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে নানা ধরনের বিচরণশীল প্রাণী ছড়িয়ে দেন।
সপ্তমত, যাচাই-বাছাই না করে যা শোনা যায় তার সবকিছু প্রচার করার প্রবণতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মুসলিম শরিফের ভূমিকা ও আবু দাউদের চার হাজার ৯৯২ নম্বর হাদিসে স্পষ্ট বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যা কিছু শোনে তা-ই বলে বেড়ানো তার মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অসত্য তথ্যের ফলে সমাজে নানা বিভ্রান্তি ও ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি বিনষ্টের ঝুঁকি থাকে।
অষ্টমত, বন্ধুর সঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত সাক্ষাৎ করা থেকেও বিরত থাকার পরামর্শ রয়েছে। মুসনাদে বাজ্জারের নয় হাজার ৩১৫ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিরতি দিয়ে সাক্ষাৎ করার পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় এবং একঘেয়েমি না আসে। তবে বাবা-মা, বিশেষ আত্মীয় কিংবা যৌথ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা প্রযোজ্য নয়।
নবমত ও দশমত, প্রাকৃতিক ভোগ-ব্যবহারে সীমালঙ্ঘন এবং অতিরিক্ত পেট ভরে খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করতে বলা হয়েছে। সুরা আল-আরাফের ৩১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা পানাহারে অপচয় না করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি তিরমিজির দুই হাজার ৪৭৮ নম্বর হাদিসে মহানবী (সা.) বেশি পরিমাণে পেট ভরে খাওয়ার তীব্র সমালোচনা করে উল্লেখ করেছেন, দুনিয়ায় যারা অতিরিক্ত আহার করে, বিচার দিবসে তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকবে। মাত্রাতিরিক্ত আহারের ফলে অলসতা বাড়ে, মেধা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইবাদতের একাগ্রতা নষ্ট হয়।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন