সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
প্রান্তিক এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের পড়াশোনা আনন্দদায়ক করতে পঞ্চগড়ের সীমান্তবর্তী তেঁতুলিয়ায় শুরু হয়েছে ব্যতিক্রমী স্কুল সিলেবাস থিয়েটার কার্যক্রম। সোমবার বিকেলে উপজেলার শারিয়ালজোত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগের উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোসা. শুকরিয়া পারভীন। জেলা প্রশাসনের সার্বিক উদ্যোগে পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন বিষয়ক সংগঠন কারিগর এই বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
সীমান্তবর্তী অবহেলিত শিশুদের মেধা বিকাশে নেওয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ। কার্যক্রমের আওতায় প্রান্তিক এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সুবিধাবঞ্চিত শিশু শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন গল্প ও পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তু নিয়ে নাটক নির্মাণ করে এবং বিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই তা সহপাঠী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সামনে পরিবেশন করে। এই আয়োজনের আগে শিক্ষার্থীদের টানা সাত দিনব্যাপী বিশেষ নাট্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঁচটি শ্রেণি থেকে ২৫ জন শিক্ষার্থীকে বাছাই করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ থিয়েটার ক্লাব।
পাঠ্যবইয়ের গল্প বা নাটিকা অবলম্বনে তাদের মেডিটেশন বা ধ্যান, শারীরিক ও কণ্ঠের বিভিন্ন ব্যায়াম, শুদ্ধ উচ্চারণ, সাবলীল বাচনভঙ্গি, অভিনয়কলা, গল্পপাঠ, সংগীত, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস, প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং ইতিবাচক সামাজিক আচরণের ওপর ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে অর্জিত সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরাই গল্প নির্বাচন করে নাট্যরূপ দেয় এবং সম্মিলিত অভিনয়ে অংশ নেয়। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, এই শিক্ষণ প্রক্রিয়াটি নিয়মিত চলমান থাকবে এবং থিয়েটার ক্লাবের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ধাপে ধাপে এই সিলেবাস থিয়েটারের সাথে সম্পৃক্ত হবে।
উদ্বোধনী দিনে বিদ্যালয়ের নবগঠিত শারিয়াল থিয়েটার পরিবেশন করে বিশেষ নাটক বাঁশিওয়ালা। নাটকটির সার্বিক নির্দেশনা দেন সরকার হায়দার। মঞ্চায়নে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরুশা, সারা, আশরাফি, রোমিও, মেহেদী, সাদিকুল, জেসিকা, রিমি, জান্নাতি, মনি, রাতুল, ইমরান, সোহান, বাইজিদ, নিহাদ, হ্যাপি, সামিয়া, ইতি, ফয়সাল, সৌরভ ও মাহিম। নাটকটির সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন সহকারী শিক্ষক হাবিবুর রহমান এবং প্রযোজনায় ছিলেন রেজাউল ইসলাম। এছাড়া নাটকের চরিত্রভিত্তিক পোশাক ও সামগ্রী পরিকল্পনা করেন ফাহিম আহমেদ এবং আবহসংগীতের বিন্যাস করেন রইসউদ্দিন।
আয়োজক সংস্থা কারিগরের নির্বাহী পরিচালক সরকার হায়দার জানান, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রান্তিক ও সীমান্ত জনপদের শিশুরা নানা ধরনের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকে। অথচ প্রাথমিক স্তরের মূল পাঠ্যক্রমেই বহুমুখী সাংস্কৃতিক উপাদান বিদ্যমান। স্কুল সিলেবাস থিয়েটারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেমন নিজেরা আনন্দ নিয়ে পড়া বুঝতে পারবে, তেমনি একই সাথে তাদের অভিভাবক এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও বিদ্যালয় মাঠে এসে এটি উপভোগ করতে পারবেন।
জেলা প্রশাসনের এই সৃজনশীল মডেলটি প্রাথমিক পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে তেঁতুলিয়া উপজেলার মোট ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচালনা করা হবে এবং পরবর্তীতে প্রতিটি বিদ্যালয়ের মঞ্চায়ন শেষে মোট ১০টি নাটক নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু নাট্য উৎসবের আয়োজন করা হবে। নাটকে অংশ নেওয়া শিশু শিক্ষার্থী রাতুল ইসলাম তার অনুভূতি জানিয়ে বলে, এই কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা যোগব্যায়াম, হাত ও মুখের নানা শারীরিক কসরত শিখেছে। একই সাথে শুদ্ধ প্রমিত বাংলায় কথা বলা এবং ইংরেজি ও বাংলার সঠিক উচ্চারণ শৈলী রপ্ত করতে পেরেছে।
আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতি জানায়, সীমান্ত এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে এর আগে কখনোই তাদের নাটক দেখার বা করার কোনো সুযোগ ছিল না। এবারই তারা প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মহড়া শেষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে ও প্রকাশ্যে সাবলীল অভিনয় করতে পারছে। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হাবিবুর রহমান জানান, শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নানা সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পেলেও সীমান্ত অঞ্চলের প্রান্তিক শিশুদের সেই সুযোগ থাকে না। তবে এখন তারা পাঠ্যবইয়ের জটিল বিষয়গুলো নাট্যরূপের মাধ্যমে অতি সহজে ও আনন্দের সাথে শিখছে। এর ফলে তাদের মধ্যে নিয়মিত সাংস্কৃতিক চর্চার অভ্যাস গড়ে উঠছে এবং একই সঙ্গে শিশুদের ভেতরের সুপ্ত মেধা ও আত্মবিশ্বাস বিকশিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীন বলেন, থিয়েটার একটি সমন্বিত শিল্পমাধ্যম এবং এটি কেবল নিছক অভিনয় বা নাটক প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রকৃত শিল্পীকে কথা বলা, রুচিশীল খাদ্যাভ্যাস এবং পরিধানের পোশাক থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শিল্পের নান্দনিক নিয়ম অনুসরণ করতে হয়। তাই থিয়েটারের নিয়মানুবর্তিতা প্রতিটি মানুষের জন্যই একটি অনুসরণীয় জীবনাচরণ। পাঠ্যক্রমের কাঠখোট্টা পড়াশোনাকে এই শিল্পমাধ্যমের সাথে সমন্বয় করে প্রান্তিক শিশুদের মাঝে ছড়িয়ে দিলে তাদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে, মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ত্বরান্বিত হবে এবং সৃজনশীল চিন্তাচেতনার প্রসার ঘটবে।
উদ্বোধনী সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ইমাম রাজী টুলু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সীমা শারমিন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির প্রতিনিধি মকবুলার রহমানসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন