সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ফুলবাড়ীর আশ্রয়ণ প্রকল্প ২৫ কোটি টাকার রঙিন ঘরে ঝুলছে তালা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২৬, ২০২৫, ০৯:৩১ পিএম

ফুলবাড়ীর আশ্রয়ণ প্রকল্প ২৫ কোটি টাকার রঙিন ঘরে ঝুলছে তালা

দিনাজপুর টিভি

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা সদর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ফসলি মাঠ পেরিয়ে চোখে পড়ে ছোট ছোট রঙিন ঘরবাড়ি। কোনো ছাদের চাল লাল, কোনটা আবার সবুজ— দূর থেকে পুরো এলাকা দেখতে বাংলাদেশের পতাকার মতো লাগে। কিন্তু এই সুন্দর দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার বাস্তবতা। আশ্রয়ণের ঘরগুলো ফাঁকা, অধিকাংশ ঘরেই ঝুলছে তালা।জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে “আশ্রয়ণ প্রকল্প”-এর আওতায় ফুলবাড়ী উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে চার ধাপে মোট ১ হাজার ২৭০টি বাড়ি নির্মিত হয়েছিল।

এর জন্য ব্যয় হয় ২৫ কোটি ৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। উদ্দেশ্য ছিল গৃহহীনদের পুনর্বাসন, কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ বাড়িতেই মানুষ থাকে না।প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ভূমিহীন পরিবারকে দুই শতক জমির ওপর দুই কক্ষবিশিষ্ট আধাপাকা ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে প্রতিটি ঘরের ব্যয় ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা, দ্বিতীয় পর্যায়ে ১ লাখ ৯০ হাজার, তৃতীয় পর্যায়ে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫০০ এবং চতুর্থ পর্যায়ে ২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা ধরা হয়েছিল। চার ধাপে নির্মিত এই ঘরগুলো এখন অযত্নে পড়ে আছে।উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বাসুদেবপুর গ্রামে ১৬৫টি বাড়ি নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৫০টি পরিবার বসবাস করছে, বাকিগুলোতে ঝুলছে তালা।

সেখানকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, আশ্রয়ণ গ্রাম থেকে মূল সড়কে যাওয়ার রাস্তা নেই। যা আছে তা কাঁচা ও কাদাময়, বিশেষ করে বর্ষায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। নেই মসজিদ বা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।বাসুদেবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘিরে গড়ে তোলা সমবায় সমিতির সদস্য হানিফ শেখ, হাফিজুল ইসলাম ও জাকির হোসেন বলেন, "১৬৫টি ঘরের মধ্যে প্রায় ১১৫টি খালি। মালিক আছে, কিন্তু তারা আসেন না।" বাসিন্দা মানিক মিয়া বলেন, "এখানে বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাড়ি পেয়েছে। তবে অনেকে স্থায়ীভাবে থাকতে চায় না। রাস্তা ও মসজিদ নেই, এছাড়া এখানে কোনো কাজকর্ম নেই, তাই অনেক কষ্ট হয়।

"উপজেলার সবচেয়ে বড় আশ্রয়ণ গ্রাম খয়েরবাড়ী ইউনিয়নের বালুপাড়া আবাসন। সেখানে মোট ২৪৪টি বাড়ি নির্মিত হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ১০০টি ঘরে মানুষ বসবাস করছে, বাকিগুলো খালি। ওই আশ্রায়ণের বাসিন্দা মহসিনা ও আমজাদ বলেন, "অনেকেই ফুলবাড়ী পৌর এলাকার মানুষ, এখানে কোনো কাজ না থাকায় তারা থাকেন না। মাঝে মাঝে এসে ঘর দেখে যান।"বালুপাড়া আবাসনের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেউ কেউ বছরে একবার এসে দখল নিশ্চিত করে চলে যান। নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায়ও অনেকে সেখানে থাকতে চান না।

বাসিন্দা জিয়াউর জানান, "আমাদের এখানে রাস্তার সমস্যা, বর্ষায় চলাচল চরম সমস্যা হয়। এছাড়া বেশকিছু পানির টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। কাজকর্ম নেই, এমন অনেক সমস্যার কারণে এখানে অনেকে বসবাস করে না। কিছুদিন আগে অনিছুর নামে এক ব্যক্তি ফুলবাড়ীর এক লোকের কাছে বাড়ি হস্তান্তর করেছে।"অন্যান্য আশ্রয়ণেও একই চিত্র। উপজেলার কাজিহাল ইউনিয়নের পুকুরি মোড় আবাসন প্রকল্পে ৮টি বাড়ির মধ্যে মাত্র ৩টি পরিবার এবং এলুয়াড়ী ইউনিয়নের শিবপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৩৪টি ঘরের মধ্যে মাত্র ৫টিতে মানুষ থাকেন।

স্থানীয়রা বলছেন, ঘর বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও অনিয়ম হয়েছে। ঘর বরাদ্দ দেওয়ার সময় সঠিক যাচাই-বাছাই করা হয়নি। অনেকেই ঘর বরাদ্দ নিয়েও অন্যত্র বসবাস করছেন; কেউ কেউ ঘর অন্যের কাছে দেখাশোনার জন্য দিয়ে গেছেন। ফলে কিছু ঘরে হাঁস-মুরগি বা গরু-ছাগল পালন ছাড়া আর কোনো ব্যবহার নেই।সচেতন মহল বলছেন, দূর থেকে রঙিন ছাদের এই ঘরগুলো দেখলে উন্নয়নের সাফল্যের প্রতীক মনে হলেও, বাস্তবে উপজেলার খয়েরবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শামীম হোসেন বলেন, "আমার জানামতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতে অনেকেই বসবাস করেন না।

কেউ অন্যত্র কাজ করেন, অন্যকে থাকার জন্য দিয়ে চলে গেছেন। তদন্ত করে এসব ঘর প্রকৃত ভূমিহীনদের কাছে হস্তান্তর করা গেলে তারা উপকৃত হবে।"বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইসাহাক আলী জানান, "অতীতে যারা ঘর বরাদ্দ দিয়েছে, তারা যাচাই-বাছাই করেই দিয়েছে। তবে কিছু লোক হয়তো গার্মেন্টসে কাজ করে বা কাজের জন্য অন্যত্র গেছে, তাই হয়তো ফাঁকা আছে। তবে যদি কেউ জমি থাকার পরেও ঘর বরাদ্দ নিয়ে থাকে, এমন তথ্য আমাকে জানালে সে বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"