সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম
উপসাগরীয় অঞ্চল ও রাশিয়া থেকে আন্তর্জাতিক সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে ডিজেলের বাজারে তীব্র অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। আমদানি-নির্ভর আন্তর্জাতিক বাজারগুলোতে প্রস্তুতকৃত পরিশোধিত ডিজেলের দাম ও বাণিজ্যিক শোধনাগারগুলোর মুনাফার মার্জিন নজিরবিহীন হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের রপ্তানি আয় সীমিত করার লক্ষ্যে দেশটির অভ্যন্তরীণ তেল শোধনাগার ও রপ্তানিমুখী অবকাঠামোর ওপর ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ তেল শোধন সক্ষমতা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
একই সাথে পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের দেশগুলো থেকে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবহনে অচলাবস্থা দেখা দেওয়ায় বিশ্ববাজারে প্রস্তুতকৃত ডিজেল সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল মূল্যের ব্যাপক উল্লম্ফন দেখা গেছে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে ত্রিদেশীয় যুদ্ধাবস্থা তৈরির প্রাক্কালে জার্মানি ও ফ্রান্সে প্রতি লিটার ডিজেলের বাজারদর ছিল প্রায় ১ দশমিক ৮০ ইউরো বা ২ দশমিক ০৭ ডলার। যা সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রায় ২ দশমিক ৪০ ইউরোতে ঠেকেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রতি গ্যালন ডিজেল ৩ দশমিক ৭৫ ডলারে বিক্রি হলেও গত ১১ সেপ্টেম্বর তা প্রথমবারের মতো রেকর্ড ৬ ডলারের সীমা অতিক্রম করে। অন্যদিকে খোদ রাশিয়াতেও অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দর বেড়েছে। যুদ্ধপূর্ব সময়ে দেশটিতে প্রতি লিটার ডিজেল প্রায় ৭৭ রুবল বা ৯১ সেন্টে বিক্রি হলেও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তা বেড়ে ৮২ থেকে ৮৩ রুবলে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল পেট্রোলিয়াম পণ্য বিশ্ববাজারে পরিবাহিত হয়।
কিন্তু চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট দীর্ঘ অচলাবস্থা কেবল অপরিশোধিত তেল সরবরাহকেই সংকুচিত করেনি, বরং ডিজেল, উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো পরিশোধিত উপজাতের সরবরাহ ব্যবস্থাকেও চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছে। উপসাগরীয় তেল শোধনাগারগুলোতে প্রক্রিয়াজাত ডিজেল ও গ্যাস-অয়েলের সিংহভাগ এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার ভোক্তা বাজারগুলোতে জাহাজযোগে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল রুদ্ধ হওয়ায় প্রক্রিয়াজাত জ্বালানির প্রাপ্যতা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় তলানিতে নেমে এসেছে।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার সেপ্টেম্বর মাসের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন বলছে গত আগস্টে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে ডিজেল ও গ্যাস-অয়েলের নিট রপ্তানির পরিমাণ ছিল দৈনিক মাত্র ৩ লাখ ৯০ হাজার ব্যারেল। এই নিট রপ্তানির পরিমাণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী স্বাভাবিক সময়ের মোট পরিমাণের এক-চতুর্থাংশের সামান্য বেশি। গত ফেব্রুয়ারির স্বাভাবিক সময়ের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় আগস্টে উপসাগরীয় অঞ্চল এবং রাশিয়া থেকে যৌথভাবে প্রস্তুতকৃত ডিজেল ও গ্যাস-অয়েলের নিট সরবরাহ দৈনিক ১৬ লাখ ব্যারেল কমে গেছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বব্যাপী মোট পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহের প্রায় ৪৫ শতাংশই আসত এই দুটি একক ভৌগোলিক উৎস থেকে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের মতো ডিস্টিলেট জ্বালানি শোধন থেকে শোধনাগারগুলোর নিট মুনাফা পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে মোটর গ্যাসোলিন শোধন থেকে বাণিজ্যিক শোধনাগারগুলোর পরিচালন মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে আগস্টে আটলান্টিক অববাহিকার তেল শোধনাগারগুলোর সর্বকালের রেকর্ড মুনাফা অর্জনের মূল কারণই ছিল আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেলের মধ্যকার মূল্যের অস্বাভাবিক ব্যবধান বৃদ্ধি পাওয়া।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন