সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২৬,

মেনোপজের পরেও সন্তান ধারণ সম্ভব জানালেন চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্য ডেস্ক

অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১১:১০ পিএম

মেনোপজের পরেও সন্তান ধারণ সম্ভব জানালেন চিকিৎসকরা

কর্মজীবন গোছানো, সঠিক জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত নানা বাস্তবতায় নারীদের বিয়ের বয়স পিছিয়ে যাওয়া আধুনিক সমাজে একটি সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের প্রজনন ক্ষমতা বা ডিম্বাণুর কার্যকারিতা প্রাকৃতিকভাবে কমতে শুরু করলেও আধুনিক প্রজনন চিকিৎসাবিজ্ঞান এনে দিয়েছে বিকল্প সমাধান। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ডিম্বাণু সংরক্ষণ বা এগ ফ্রিজিং। ভারতের রাজধানী দিল্লির বিভিন্ন আধুনিক আইভিএফ ক্লিনিকে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বহু নারী নিজেদের ডিম্বাণু ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে রাখছেন, যা পরবর্তী সময়ে মেনোপজ বা প্রাকৃতিকভাবে ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও সন্তান ধারণের পথ সুগম রাখছে।

প্রজনন চিকিৎসকদের মতে, ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখাকে নারীদের প্রজননের এক ধরনের আগাম জীবনবীমা বলা যেতে পারে। আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. অনুপ গুপ্ত জানান, ডিম্বাণু সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অন্তত দুই থেকে তিনটি চক্র সম্পন্ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে গর্ভধারণের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক সুস্থ ডিম্বাণু হাতে থাকে। তিনি উল্লেখ করেন, যদি কোনো নারী ৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করতে না পারেন এবং ৪৫ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর তাঁর মেনোপজ হয়ে যায়, তবুও পূর্বে হিমায়িত করে রাখা ডিম্বাণুর সহায়তায় তিনি সুস্থভাবে গর্ভধারণ করতে সক্ষম হবেন। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, ডিম্বাশয় ডিম্বাণু উৎপাদন বন্ধ করলেও নারীর জরায়ু বা ইউটেরাস দীর্ঘ বয়স পর্যন্ত ভ্রূণ ধারণ করার উপযুক্ত অবস্থায় অক্ষত থাকে।

ডিম্বাণু সংগ্রহের এই বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নারীর পরবর্তী স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ব্যাঘাত ঘটায় না। ভ্রূণতত্ত্ববিদ অলকা গুপ্ত জানান, ডিম্বাণু সংরক্ষণের সময় ডিম্বাশয় থেকে সমস্ত ডিম্বাণু একেবারে বের করে নেওয়া হয় না। প্রতি মাসে ডিম্বাশয়ে প্রাকৃতিকভাবে একাধিক ডিম্বাণুর বিকাশ শুরু হলেও স্বাভাবিক নিয়মে মাত্র একটি ডিম্বাণু পরিপক্ব হয় এবং বাকিগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তিনি জানান, চিকিৎসায় মূলত হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে ওই নির্দিষ্ট মাসে নষ্ট হয়ে যেতে বসা ডিম্বাণুগুলোকে পুষ্ট করে সংগ্রহ করা হয়। একজন নারী যত কম বয়সে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন, ডিম্বাণুর গুণগত মান তত বেশি নিখুঁত থাকবে। তবে অতিরিক্ত বয়সে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে ডিম্বাণুর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় সাফল্যের সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে।

ডিম্বাণু সংরক্ষণকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ভুল ধারণা ও আতঙ্ক চিকিৎসকেরা বৈজ্ঞানিকভাবে নাকচ করে দিয়েছেন। পুরুষের শুক্রাণু সংরক্ষণ অত্যন্ত সহজ হলেও নারীদের ডিম্বাণু সংগ্রহের জন্য একটি বিশেষ চিকিৎসা চক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। চিকিৎসকরা জানান, ঋতুস্রাবের দ্বিতীয় দিনে নারীদের বিশেষ হরমোন ইনজেকশন দেওয়া শুরু হয়। আধুনিক চিকিৎসায় এখন সূচবিহীন ইনজেকশন বা রোগী নিজে নিজেই নিতে পারেন এমন ডিভাইস সহজলভ্য হয়েছে। এভাবে প্রায় দশ দিন ইনজেকশন প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা ও আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ডিম্বাণুর পরিপক্বতা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

দ্বাদশতম দিনে সাত থেকে আট মিনিটের সংক্ষিপ্ত অবশ বা অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ব্যথাহীনভাবে ডিম্বাণুগুলো বের করে নেওয়া হয়। এই কার্যক্রমে তলপেটে কোনো ধরনের কাটাছেঁড়া বা সেলাই করার প্রয়োজন পড়ে না; বরং বিশেষ আল্ট্রাসাউন্ড নির্দেশিত সূক্ষ্ম সূচের সাহায্যে যোনিপথের মাধ্যমে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়া শেষে মাত্র দুই ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে থেকেই রোগী স্বাভাবিকভাবে হেঁটে বাড়ি ফিরে যেতে পারেন। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট করেন যে হরমোন ইনজেকশনের কারণে ওজন বৃদ্ধি পায় না, কেবল অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরেই স্বাভাবিক শারীরিক কারণে ওজন বাড়ে।

অনেকে ডিম্বাণু কম বের হওয়ার আশঙ্কায় দ্বিধায় ভোগেন উল্লেখ করে অলকা গুপ্ত জানান, আধুনিক জীবনের মানসিক চাপ ও কাজের বোঝার কারণে ২০ বছর বয়স থেকেই অনেকের ডিম্বাশয়ের সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যেতে পারে। ফলে বাইরে থেকে আপাতদৃষ্টিতে শারীরিকভাবে তরুণ দেখালেও অভ্যন্তরীণ প্রজনন স্বাস্থ্য দুর্বল হতে পারে। শরীরে কৃত্রিম কোনো অপরিচিত উপাদান প্রবেশ করানো হয় না, বরং স্বাভাবিক হরমোন সাময়িকভাবে একটু বেশি মাত্রায় প্রয়োগ করে ছয় মাসের সম্ভাব্য ডিম্বাণু একসঙ্গে সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত ডিম্বাণুগুলোকে ল্যাবরেটরিতে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার তরল নাইট্রোজেনে সংরক্ষণ করা হয়।

ডা. অনুপ গুপ্ত নিশ্চিত করেন, এই চরম শীতল পরিবেশে ডিম্বাণুর কোষীয় বৃদ্ধি সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়, যার ফলে ডিম্বাণু নষ্ট না হয়ে বছরের পর বছর বা অনন্তকাল পর্যন্ত গুণমান অক্ষুণ্ণ রেখে সংরক্ষিত থাকতে পারে। পরবর্তীতে ওই নারী যখনই সন্তান নিতে প্রস্তুত হন, তখন ডিম্বাণু বের করে পুরুষ সঙ্গীর শুক্রাণুর সঙ্গে ল্যাবরেটরিতে নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। ভ্রূণ প্রতিস্থাপনে ডিম্বাণু সংগ্রহের চেয়েও কম সময় লাগে এবং কেবল একটি সাধারণ ক্যাথেটার বা সূক্ষ্ম নলের মাধ্যমে জরায়ুর ভেতরে ভ্রূণটি সাবধানে প্রতিস্থাপন করে দেওয়া হয়। এর ঠিক দুই সপ্তাহ পর সাধারণ গর্ভাবস্থা পরীক্ষার মাধ্যমে সফল গর্ভধারণের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়।

পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা পিসিওএস আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রেও ডিম্বাণু সংরক্ষণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সফলভাবে কার্যকর। ডা. অনুপ গুপ্ত জানান, পিসিওএস থাকা নারীদের ক্ষেত্রে হাইপারস্টিমুলেশন যেন না ঘটে সেদিকে বিশেষ চিকিৎসা সতর্কতা বজায় রাখতে হয়, তবে তাদের ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি থাকায় সংরক্ষণ প্রক্রিয়াটি আরও সুবিধাজনক হয়। এছাড়া ডিম্বাশয়ে নাড়াচাড়ার কারণে ওভারিয়ান ক্যানসার বা জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে বলে যে পুরনো কুসংস্কার প্রচলিত ছিল, তা আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণায় সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ নারী কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা টিউমারের ঝুঁকি ছাড়াই নিরাপদে এই পদ্ধতির সুফল গ্রহণ করছেন।

চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়ে ডা. অনুপ গুপ্ত জানান, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা, হরমোন ইনজেকশন এবং ডিম্বাণু সংগ্রহের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সর্বমোট দেড় থেকে দুই লাখ ভারতীয় রুপির মতো খরচ হয়। এর পাশাপাশি সংগৃহীত ডিম্বাণুগুলো ক্রায়োপ্রিজারভেশন বা বিশেষ হিমাগারে নিরাপদে সংরক্ষণ করে রাখার জন্য প্রতি ছয় মাসের হিসাবে প্রায় দশ হাজার রুপি সংরক্ষণ ফি প্রদান করতে হয়। এর ফলে ক্যারিয়ার ও মাতৃত্বের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করে নারীরা তাঁদের জৈবিক সময়সীমাকে স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার বৈজ্ঞানিক সুযোগ পাচ্ছেন।