শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬,

জেলের পেট থেকে ২৬ ইঞ্চির জীবন্ত বাইম মাছ উদ্ধার

স্বাস্থ্য ডেস্ক

অক্টোবর ৩, ২০২৬, ০৮:০১ পিএম

জেলের পেট থেকে ২৬ ইঞ্চির জীবন্ত বাইম মাছ উদ্ধার

ছবি: সংগৃহীত

মানবদেহের ভেতরে কোনো জীবন্ত জলজ প্রাণী প্রবেশের ঘটনা চিকিৎসাবিজ্ঞানে অত্যন্ত বিরল হলেও বাংলাদেশে এমনই এক অবিশ্বাস্য চিকিৎসাগত জটিলতার ঘটনা ঘটেছে। মাছ ধরার সময় অসাবধানতাবশত শরীরের সংবেদনশীল পথ দিয়ে প্রায় ২৬ ইঞ্চি লম্বা একটি জীবন্ত বাইম মাছ প্রবেশ করার পর জরুরি অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা অপসারণ করেছেন চিকিৎসকেরা। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সার্জারি কেস রিপোর্টস-এ এই বিরল কেস স্টাডিটি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জটিল অস্ত্রোপচারে রোগীর জীবন রক্ষা পায়।

চিকিৎসা বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ৫৫ বছর বয়সী এক পেশাদার জেলে স্থানীয় জলাশয়ে মাছ ধরার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন। একটি জীবন্ত বাইম মাছ তার পায়ুপথ দিয়ে শরীরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। চরম সামাজিক লজ্জা ও অস্বস্তির কারণে তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটনাটি চিকিৎসকদের কাছে প্রকাশ করেননি। তিনি ধারণা করেছিলেন প্রাণীটি হয়তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নিজে থেকেই শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পেটে তীব্র যন্ত্রণা এবং অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।

পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ও নেপালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি যৌথ মেডিক্যাল দল জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে। এক্স-রে ও অন্যান্য আধুনিক স্ক্যানিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে রোগীর অন্ত্রের দেয়াল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পেটের ভেতরে প্রাণঘাতী সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। রোগীর সিগময়েড কোলনে প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার বা দুই ইঞ্চি পরিমাপের একটি সুনির্দিষ্ট ছিদ্র তৈরি হয়েছিল। অন্ত্রের এমন ক্ষতের ফলে পেরিটোনাইটিস বা পেটের অভ্যন্তরীণ আবরণে তীব্র বিষাক্ত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার নিশ্চিত ঝুঁকি দেখা দেয়।

জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকেরা কালবিলম্ব না করে জরুরি অস্ত্রোপচার ও কোলস্টমি সম্পন্ন করেন। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগীর কোলন থেকে প্রায় ২৬ ইঞ্চি দীর্ঘ জীবন্ত বাইম মাছটি সফলভাবে বের করে আনা হয়। দ্রুততম সময়ে যথাযথ চিকিৎসা পদক্ষেপ গ্রহণ করায় রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটতে থাকে এবং অস্ত্রোপচারের চার দিন পর সুস্থ অবস্থায় তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এই আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গবেষণাপত্রটিতে বাংলাদেশের চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী মবিন ইবনে মকবুল, সৌমিক রায়, অমর্ত্য নারায়ণ রায় ও মোস্তফা নওয়াজ এবং নেপালের গবেষক অমৃতা শ্রেষ্ঠা যুক্ত ছিলেন। 

গবেষক দলটি উল্লেখ করেছে যে একটি জীবন্ত জলজ মাছ মানুষের অভ্যন্তরীণ অন্ত্রের দেয়াল ভেদ করে এমন প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরির দৃষ্টান্ত বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত বিরল। গবেষণাপত্রে ২০০৪ সালে হংকংয়ে ঘটে যাওয়া একটি পূর্ববর্তী ঘটনার তুলনামূলক রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তি মলদ্বারে মাছ প্রবেশ করিয়ে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছিলেন। এই চিকিৎসাগত ঘটনাটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সতর্কবার্তা সামনে এনেছে। 

গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে তীব্র লজ্জা, মানসিক ভয় কিংবা দ্বিধার কারণে বহু রোগী চিকিৎসকদের কাছে সমস্যার প্রকৃত ও মূল কারণ গোপন করার চেষ্টা করেন। অথচ সঠিক সময়ে প্রকৃত সত্য জানা গেলে চিকিৎসকেরা দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন এবং যেকোনো সম্ভাব্য জীবনহানির ঝুঁকি বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব হয়। তাই পেটে তীব্র ব্যথা ও অস্বাভাবিক উপসর্গ নিয়ে আসা যেকোনো রোগীর ক্ষেত্রে বিস্তারিত পারিবারিক ও শারীরিক চিকিৎসার ইতিহাস নিখুঁতভাবে জানার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা।