শনিবার, ০৩ অক্টোবর, ২০২৬,
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন

বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান ১০ কারণ: শীর্ষে হৃদরোগ, এরপর স্ট্রোক

স্বাস্থ্য ডেস্ক

অক্টোবর ৩, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

বিশ্বে মৃত্যুর প্রধান ১০ কারণ: শীর্ষে হৃদরোগ, এরপর স্ট্রোক

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল ইস্কেমিক হৃদরোগ। এর পরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী রোগ হিসেবে অবস্থান করছে স্ট্রোক।

গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

এর মধ্যে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে শীর্ষ ১০টি কারণে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৪ শতাংশ। এই ১০টি কারণের মধ্যে আটটিই অসংক্রামক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা বৈশ্বিক মৃত্যুর প্রায় ৪৭ শতাংশের জন্য দায়ী। ২০২৩ সালে শুধু ইস্কেমিক হৃদরোগেই মারা গেছেন প্রায় ৯৫ লাখ মানুষ। মোট মৃত্যুর প্রায় ১৬ শতাংশের জন্য দায়ী এই রোগটি ২০০০ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ লাখ বেশি প্রাণ কেড়েছে। অন্যদিকে, স্ট্রোকে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষের, যা বৈশ্বিক মৃত্যুর ১১ শতাংশ।

মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি।

এতে মারা গেছেন প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ। চতুর্থ অবস্থানে থাকা নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২৭ লাখ মানুষের। করোনাভাইরাস মহামারির পর এটি আবারও বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগে পরিণত হয়েছে। পঞ্চম স্থানে রয়েছে আলঝেইমার রোগ ও অন্যান্য ডিমেনশিয়া, যাতে ২১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। লক্ষণীয়ভাবে, এ রোগে মৃতদের প্রায় ৬৬ শতাংশই নারী। ষষ্ঠ অবস্থানে থাকা ডায়াবেটিসে মারা গেছেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ, যা ২০০০ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সপ্তম স্থানে রয়েছে শ্বাসনালি, ব্রংকাস ও ফুসফুসের ক্যানসার, যাতে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১৮ লাখ মানুষের। ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১১ লাখ।

কিডনি রোগ লাফিয়ে নবম স্থানে উঠে এসেছে।

২০০০ সালে এটি বিশ্বে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ১৭তম স্থানে থাকলেও ২০২৩ সালে এই রোগে মৃত্যু ৮৬ শতাংশ বেড়েছে। দশম অবস্থানে রয়েছে ডায়রিয়াজনিত রোগ, যার প্রকোপ মূলত নিম্নআয়ের দেশগুলোতে বেশি।

মহামারির শুরুর দিকে শীর্ষ ঘাতক হয়ে ওঠা কোভিড-১৯ এখন আর প্রথম ১০ কারণের তালিকায় নেই। ২০২০ সালে প্রায় ৫৩ লাখ এবং ২০২১ সালে ৯৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকা এই ভাইরাসে ২০২৩ সালে মৃত্যু কমে প্রায় নয় লাখে দাঁড়িয়েছে। ফলে এটি শীর্ষ তালিকা থেকে বাদ পড়ে ১৪তম স্থানে নেমে গেছে। ২০০০ সালে মৃত্যুর সপ্তম প্রধান কারণ এইচআইভি ও এইডস-ও এখন আর এই তালিকায় নেই। গত ২৩ বছরে এই রোগে মৃত্যু ৬২ শতাংশ কমেছে এবং এটি বর্তমানে ২২তম স্থানে রয়েছে। অকাল জন্মজনিত জটিলতায় মৃত্যুও ২০০০ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন আয়ের দেশে মৃত্যুর কারণের এই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

নিম্ন আয়ের দেশগুলোর শীর্ষ ১০ কারণের সাতটিই সংক্রামক রোগ, যার মধ্যে নিম্ন শ্বাসনালির সংক্রমণ প্রধান। ম্যালেরিয়া, যক্ষ্মা এবং এইচআইভি এখনও এসব দেশের শীর্ষ ১০ কারণের অন্তর্ভুক্ত, যদিও ২০০০ সাল থেকে ডায়রিয়ায় মৃত্যু অর্ধেকের মতো কমেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের মিশ্র প্রভাব দেখা যায়। সেখানে ৫টি অসংক্রামক রোগের পাশাপাশি চারটি সংক্রামক/মাতৃজনিত সমস্যা ও একটি সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর কারণ রয়েছে। তবে এই স্তরের দেশগুলোতে ইস্কেমিক হৃদরোগ, স্ট্রোক ও সিওপিডিতে মৃত্যু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং ডায়াবেটিস ১৫তম থেকে পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছে, যেখানে মৃত্যু বেড়েছে তিনগুণেরও বেশি।

উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে ক্যানসার ও ডিমেনশিয়ার প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

এসব দেশে শীর্ষ ১০ কারণের আটটিই অসংক্রামক রোগ। ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যু দ্বিগুণের বেশি (অতিরিক্ত ৫ লাখ ২০ হাজার) হয়েছে। আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ায় মৃত্যু তিনগুণের বেশি বেড়ে ১৬তম থেকে পঞ্চম স্থানে পৌঁছেছে। এই স্তরের দেশগুলোতে ইস্কেমিক হৃদরোগই মৃত্যুর প্রধান কারণ, এবং একমাত্র এখানেই কোভিড-১৯ এখনও ২০২৩ সালের শীর্ষ ১০-এর মধ্যে রয়েছে।

অন্যদিকে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বার্ধক্যের প্রভাব সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। এই দেশগুলোর মৃত্যুর প্রধান ১০ কারণের নয়টিই অসংক্রামক রোগ। আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়া এখানে অত্যন্ত দ্রুত বেড়েছে; ২০০০ সালের তুলনায় মৃত্যু প্রায় চারগুণ বেড়ে এটি এখন তৃতীয় প্রধান কারণে পরিণত হয়েছে (২০০০ সালে ছিল সপ্তম)। ইস্কেমিক হৃদরোগ ও স্ট্রোক এখানে এখনও শীর্ষ দুইয়ে অবস্থান করছে, ২০২৩ সালে এই দুই রোগে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে মোট প্রায় ৩৪ লাখ মানুষ মারা গেছেন।

বয়স, লিঙ্গ ও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী তথ্য বিশ্লেষণের জন্য মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এসব তথ্যের নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যদিও নিম্ন আয়ের অনেক দেশে সঠিক তথ্য সংগ্রহ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।