অক্টোবর ২, ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম
স্তন ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা সম্ভব হলে রোগীর রোগমুক্তির সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। বিশ্বজুড়ে অক্টোবর মাসটি এই ব্যাধি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিশেষ সময় হিসেবে পালিত হয়। এটি কেবল একজন ব্যক্তির শারীরিক অসুস্থতা নয়, বরং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মানসিক স্বাস্থ্য, পারিবারিক স্থিতি, সামাজিক জীবন ও পারিবারিক আর্থিক সক্ষমতার ওপর। তবে আশার দিক হলো, সঠিক সময়ে রোগ নিরূপণ করে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা শুরু করলে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ফলাফল অর্জনের যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হয়।
শারীরিক যেকোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তনে আতঙ্কিত না হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, স্তনে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা অসঙ্গতি ধরা পড়লে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়া অনুচিত। কেননা স্তনে গুটি অনুভূত হওয়া বা যেকোনো গাঠনিক তারতম্য দেখা দেওয়ার অর্থই ক্যানসার নয়। একইভাবে সন্দেহজনক পরিবর্তন দেখা দিলে তা ফেলে রেখে দিনের পর দিন অবহেলা করাও মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। নিয়মিত শরীর পর্যবেক্ষণ, আত্মসচেতনতা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সময়োপযোগী পরামর্শই এই রোগ মোকাবিলার মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে এই রোগের ভয়াবহ চিত্রের পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসার গুরুত্ব ফুটে উঠেছে। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২৪ লাখ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন এবং এই ঘাতক ব্যাধিতে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার নারী। ওই সময়ে পৃথিবীতে প্রায় ৮২ লাখ নারী এই রোগ শরীরে বহন করে জীবনযাপন করছিলেন। বিশ্বের ১৮৬টি দেশের মধ্যে ১৬৪টি দেশে নারীদের প্রধান ক্যানসার হিসেবে এটিই চিহ্নিত হয়। ২০১৭ থেকে ২০২১ সময়কালে শনাক্ত হওয়া নারীদের তথ্য মূল্যায়নে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী শনাক্তের পরবর্তী পাঁচ বছর বেঁচে থাকার গড় হার ছিল ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে আয়ের ভিত্তিতে এতে চরম বৈষম্য রয়েছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে যেখানে পাঁচ বছর বাঁচার হার ৮৭ দশমিক ৩ শতাংশ ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে ৭৮ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে তা ৬০ দশমিক ১ শতাংশ এবং নিম্ন আয়ের দেশে মাত্র ৪১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসে। এই আঞ্চলিক তারতম্য প্রমাণ করে যে যথাসময়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ রোগীর বাঁচার হারের ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক। এই বাস্তবতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার লক্ষ্য হলো প্রতিবছর মৃত্যুহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ২০৪০ সালের মধ্যে ২৫ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু প্রতিরোধ করা।
জীববিজ্ঞানের নিয়মে স্তনের কোষ যখন অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় তখন এই রোগের বিস্তার ঘটে।
দুধ উৎপাদনকারী গ্রন্থি থেকে এই অস্বাভাবিক কোষের বিভাজন শুরু হয়ে তা পার্শ্ববর্তী নরম টিস্যুতে প্রবেশ করে এবং কালক্রমে শরীরের দূরবর্তী অন্যান্য প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। সাধারণত নারীদের মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব বহুগুণ বেশি হলেও পুরুষরাও এই ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারেন। সুনির্দিষ্ট একক কোনো কারণে রোগটি হয় না। বয়স বৃদ্ধি, জিনগত কারণ, স্থূলতা, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, মদ্যপান, তামাক সেবন, নির্দিষ্ট হরমোন থেরাপি, পূর্ববর্তী রেডিয়েশনের সংস্পর্শ এবং প্রজনন ইতিহাসের মতো বিষয়গুলো বিপদের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। তবে এসব পরিচিত ঝুঁকি ছাড়াও যেকোনো মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
লক্ষণগুলোর মধ্যে স্তনে নতুন শক্ত গুটি, স্তনের আকার বা আকৃতির পরিবর্তন, ত্বকে অস্বাভাবিক টান বা কুঁচকে যাওয়া, স্তনবৃন্তের গঠনগত রূপান্তর, বোঁটা দিয়ে রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল নিঃসরণ, বগলের নিচে ফোলা ভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় ক্যানসার ছাড়াও অন্যান্য সাধারণ জটিলতায় এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে, তাই নিজে অনুমান না করে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
রোগটির জৈবিক বৈশিষ্ট্যে বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে। দুধনালিতে শুরু হওয়া ডাক্টাল এবং লোবিউলে সৃষ্ট ক্যানসার বেশি চোখে পড়ে। এর বাইরে হরমোন-নির্ভর, HER2-পজিটিভ এবং ট্রিপল-নেগেটিভ প্রকৃতির ক্যানসার চিহ্নিত করা যায়। রোগের বিস্তারকে কয়েকটি ধাপে বা স্টেজে ভাগ করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি স্তনের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকে, যা পরবর্তী সময়ে লসিকাগ্রন্থি বা দূরবর্তী প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। রোগ নির্ণয়ে রোগীর অতীত ইতিহাস পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি আধুনিক চিত্রায়ন ও বায়োপসি করে টিস্যুর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এরপর রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ও রোগের পর্যায় বিচার করে অস্ত্রোপচার, বিকিরণ থেরাপি, কেমোথেরাপি, হরমোন চিকিৎসা ও লক্ষ্যভিত্তিক থেরাপির সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পরিকল্পনা সাজানো হয়।
দেরিতে চিকিৎসা শুরু করলে শারীরিক দুর্বলতা, তীব্র ব্যথা ও জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বৃদ্ধি পায়।
প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সুষম খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন ঝুঁকি কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে বাসাবাড়িতে তেল মালিশ, ভেষজ সেবন বা অবৈজ্ঞানিক ঘরোয়া চিকিৎসায় ক্যানসার নিরাময় সম্ভব নয়। আক্রান্ত ব্যক্তির মানসিক ভঙ্গুরতা, ভয় ও উদ্বেগ দূর করতে পরিবারের পক্ষ থেকে সহমর্মিতা দেখানো এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করা অত্যন্ত জরুরি বলে দিনাজপুর টিভি ডট কম-এর স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে জানানো হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন