অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১১:১১ পিএম
পুরুষদের স্তন ক্যানসার হতে পারে—এই চরম বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে অনেকেই রোগটির বিপজ্জনক লক্ষণগুলোকে অবহেলা করে থাকেন। সাধারণত স্তন ক্যানসারকে কেবল নারীদের রোগ মনে করা হলেও পুরুষদের শরীরেও স্তনের টিস্যু থাকে এবং সেই টিস্যুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি থেকে ক্যানসার দানা বাঁধতে পারে। নারীদের তুলনায় পুরুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা সংখ্যায় বেশ কম হলেও দেরিতে শনাক্ত হওয়ার কারণে রোগটি অনেক সময় প্রাণঘাতী রূপ নেয়। তাই বুকের কাছে কোনো অস্বাভাবিক শক্ত চাকা বা স্তনবৃন্তে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের (এনসিআই) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে শনাক্ত হওয়া মোট স্তন ক্যানসারের প্রতি ১০০টির মধ্যে একটিরও কম ঘটনা পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়।
যেকোনো বয়সের পুরুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে সাধারণত বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এর ঝুঁকি লক্ষণীয়ভাবে বাড়ে। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের স্তন ক্যানসারের সিংহভাগই শুরু হয় স্তনের ভেতরের দুধ পরিবহনকারী সরু নালির কোষ থেকে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডাক্টাল ক্যানসার’ বা ডাক্টাল কার্সিনোমা বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের স্তন ক্যানসারের ছয়টি সতর্কতামূলক লক্ষণ বিশেষভাবে চিহ্নিত করা জরুরি।
প্রথমত, বুকের কাছে শক্ত গাঁট বা মাংসপিণ্ড তৈরি হওয়া। স্তনবৃন্তের ঠিক নিচে বা আশপাশের অংশে শক্ত পিণ্ড তৈরি হওয়া কিংবা টিস্যু মোটা হয়ে যাওয়া এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ ও প্রাথমিক লক্ষণ। এই গাঁটটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যথাহীন হতে পারে, যার ফলে রোগীরা এটিকে সাধারণ চর্বি মনে করে ভুল করেন। তবে বুকে গাঁট দেখা দিলেই তা ক্যানসার নয়; পুরুষদের স্তনের টিস্যুর নিরীহ বৃদ্ধিজনিত সমস্যা গাইনেকোমাস্টিয়াতেও এমন হতে পারে। তবুও নতুন কোনো শক্ত পিণ্ড দেখা দিলে ডাক্তারি পরীক্ষা আবশ্যক।
দ্বিতীয়ত, স্তনবৃন্তের অবস্থানে বা স্বাভাবিক আকৃতিতে আকস্মিক পরিবর্তন। আগে স্বাভাবিক থাকা স্তনবৃন্ত হঠাৎ ভেতরের দিকে দেবে বা ঢুকে গেলে তা গভীর শারীরিক অসঙ্গতির নির্দেশ করে।
তৃতীয়ত, স্তনবৃন্ত থেকে তরল বা রক্ত নির্গমন। কোনো ধরনের আঘাত বা স্পষ্ট কারণ ছাড়াই বোঁটা থেকে অস্বাভাবিক রস বা রক্তমিশ্রিত তরল বের হলে কালক্ষেপণ না করে বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
চতুর্থত, বুকের ত্বকের অস্বাভাবিক রূপান্তর। স্তনের ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া, ফুলে ওঠা, খসখসে ভাব, চামড়া ওঠা কিংবা কমলার খোসার মতো ছোট ছোট গর্ত ও কুঁচকানো ভাঁজ দেখা দেওয়া ক্যানসারের সংকেত হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত যা কিছুতেই শুকায় না, তাও অবহেলা করা বিপজ্জনক।
পঞ্চমত, বগল বা কলারবোনের কাছাকাছি গ্রন্থি ফুলে যাওয়া। স্তন ক্যানসার আশপাশের লসিকাগ্রন্থিতে (লিম্ফ নোড) ছড়িয়ে পড়লে বগলের নিচে কিংবা কলারবোনের সংযোগস্থলে শক্ত পিণ্ড অনুভূত হতে পারে।
ষষ্ঠত, স্তনের টিস্যুর অস্বাভাবিক পুরুত্ব বৃদ্ধি। বুকের নির্দিষ্ট কোনো অংশের পেশি বা চামড়া পুরু হয়ে যাওয়া কিংবা দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি অনুভব করাও মূল লক্ষণগুলোর একটি।
তবে এসব উপসর্গ দেখা দিলেই নিশ্চিত ক্যানসার ধরে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। নানা নিরীহ প্রদাহ বা চর্মরোগেও এমন ঘটতে পারে, যার সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা দরকার।
এনসিআইয়ের চিকিৎসাতথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত বয়স ছাড়াও কয়েকটি সুনির্দিষ্ট শারীরিক ও বংশগত কারণ পুরুষদের এই ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। পরিবারে কোনো নারী সদস্যের স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে পুরুষদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে BRCA1 ও BRCA2 জিনের বংশগত রূপান্তর বা মিউটেশন এই রোগের প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
পূর্বে বুকের উপরিভাগে রেডিয়েশন থেরাপি নেওয়া, ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম, যকৃতের সিরোসিস, অণ্ডকোষের রোগ বা অস্ত্রোপচার এবং অতিরিক্ত স্থূলতা শরীরের ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
বুকে কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকেরা শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি রোগীর পারিবারিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করেন। এরপর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় আলট্রাসনোগ্রাম, ম্যামোগ্রাম এবং বায়োপসি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বায়োপসির মাধ্যমে সন্দেহজনক টিস্যু ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পরই কেবল ক্যানসার নিশ্চিত হয়।
রোগের ধরন ও বিস্তারের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারিত হয়। এতে শল্যচিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন, কেমোথেরাপি এবং হরমোন ব্লকিং থেরাপির ব্যবহার হয়ে থাকে। পুরুষদের স্তনে প্রাকৃতিক টিস্যু কম থাকায় অনেক সময় পুরো স্তন কেটে অপসারণ (মাস্টেক্টমি) করতে হয়, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচারও সম্ভব।
সাধারণ পুরুষদের জন্য নিয়মিত ম্যামোগ্রাম করানোর ঢালাও নিয়ম নেই। কিন্তু পরিবারে জিনগত ঝুঁকি থাকলে সচেতনতামূলক পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। লজ্জা, সংকোচ বা ভুল ধারণার কারণে চিকিৎসায় বিলম্ব না করে সময়মতো প্রাথমিক উপসর্গ যাচাই করাই রোগ নিরাময়ের প্রধান চাবিকাঠি বলে জানিয়েছে দিনাজপুর টিভি ডট কম।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন