অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১০:৩০ পিএম
চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০২৬) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রানওয়ে সম্প্রসারণ, পৃথক আধুনিক ট্রানজিট সেন্টার এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ কার্গো ভিলেজ নির্মাণের মাধ্যমে এই রূপান্তর ঘটানো হবে। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের ফলে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীনের সরাসরি বহুমুখী আকাশ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হবে।
আন্তর্জাতিক তকমা থাকলেও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি দীর্ঘদিন ধরে কেবল মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি নির্দিষ্ট রুটে সীমাবদ্ধ ছিল। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্বমুখী অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ একপ্রকার বন্ধ ছিল।
গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে ব্যবসায়ীদের পক্ষে একটি রূপরেখা পাঠান। পত্রে তিনি বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত অচলাবস্থা দূর করার আবেদন জানান। সরকারের তাৎক্ষণিক সাড়ায় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) যৌথভাবে ‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব প্রজেক্ট’-এর প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) প্রস্তুত করে। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ‘কুইক-উইন ফেজ’-এর আওতায় অবকাঠামো সংস্কার করে ওয়াইড-বডি বিমান ওঠানামা এবং ট্রানজিট যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের পূর্ণ সক্ষমতা তৈরি করা হবে।
ভৌগোলিক দিক থেকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হলেও অতীতে চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের সরাসরি ফ্লাইটগুলো অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার সংকটে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় রপ্তানিকারক ও যাত্রীদের ঢাকা অথবা বিদেশি ট্রানজিট রুটের ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রকল্পের কারিগরি প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমান দুই হাজার ৯৪০ মিটারের রানওয়ে পর্যায়ক্রমে তিন হাজার ৬০০ মিটারে উন্নীত হবে। উড়োজাহাজ পার্কিংয়ের জন্য ১১টি ন্যারো-বডি এবং আটটি ওয়াইড-বডি স্ট্যান্ড তৈরি করা হবে। বার্ষিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বর্তমানের ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৮০ লাখ থেকে এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বোর্ডিং ব্রিজের সংখ্যা দুটি থেকে বাড়িয়ে ছয়টিতে রূপান্তর করা হবে, যার চারটি হবে ওয়াইড-বডির উপযোগী।
১০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত হবে একটি স্বতন্ত্র ট্রানজিট সেন্টার।
এছাড়া রানওয়ে শক্তিশালীকরণ, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে ও দ্রুত প্রস্থান ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণের ফলে Boeing 777, Boeing 787 Dreamliner কিংবা Airbus A330 ও Airbus A350-এর মতো সর্বাধুনিক বৃহদাকৃতির উড়োজাহাজগুলো অনায়াসে অবতরণ করতে পারবে।
সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারী আমদানি-রপ্তানি হলেও পচনশীল কৃষিপণ্য, উচ্চমূল্যের তৈরি পোশাকের নমুনা, ইলেকট্রনিকস ও জরুরি ওষুধ পরিবহনে আকাশপথই প্রধান ভরসা। প্রকল্পের আওতায় প্রথম ধাপে ৭৫ হাজার থেকে এক লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো, নতুন কার্গো ভিলেজ, কোল্ড-চেইন এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস নির্মাণ করা হবে। এর ফলে তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা দ্রুত চট্টগ্রামে আসতে পারবেন এবং চীন থেকে কাঁচামাল সরাসরি আমদানি সাশ্রয়ী হবে।
প্রকল্পের মোট আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। প্রথম ধাপে সরকারি ও সহযোগী খাত থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। এর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা চেয়েছে। বাকি ৭৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার ও বেবিচক। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে আশপাশে হোটেল, শপিং মল ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণে আরও ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম অনেক আগেই এ অঞ্চলের আকাশ যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ছিল। অর্থমন্ত্রীর সক্রিয় পদক্ষেপে ফাস্টট্র্যাক মেগা প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখছে। তিনি বলেন, বিগত দুই দশকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্প বহুগুণ বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। সরাসরি আকাশ যোগাযোগ চালু হলে অর্থনীতিতে বড় রূপান্তর ঘটবে।
অবকাঠামোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সেবার মান নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন চট্টগ্রাম এভিয়েশন ক্লাবের সভাপতি মো. আছিফ চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, বিমানবন্দরটি বর্তমানে সকাল ছয়টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চালু থাকে, যা সার্বক্ষণিক বা ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা জরুরি। ল্যান্ডিং চার্জ ও জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, হংকং ও তাইওয়ানের মতো পূর্ব এশিয়ামুখী ফ্লাইটগুলোকে আকৃষ্ট করে এটিকে জ্বালানি সংগ্রহের হাব হিসেবেও কাজে লাগানো সম্ভব।
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেন জানান, উড়োজাহাজ অবতরণের পর মানসম্মত হোটেল, জ্বালানি ও সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা পেলেই আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলো এটিকে হাব হিসেবে গ্রহণ করবে। বর্তমানে সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি কার্গো ফ্লাইট ওঠানামা করলেও এয়ারলাইনগুলোর বাণিজ্যিক আগ্রহ বৃদ্ধি আবশ্যক। পূর্ণ ট্রানজিট হাব হওয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে কারিগরি যাত্রাবিরতি বা টেকনিক্যাল স্টপওভার সেবার ওপর জোর দেওয়া বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এই বিমানবন্দর দিয়ে নয় লাখ ৭৭ হাজার আন্তর্জাতিক যাত্রী যাতায়াত করেছিলেন, যা ২০২৫ সাল নাগাদ প্রায় ১০ লাখে সীমাবদ্ধ ছিল বলে জানিয়েছে দিনাজপুর টিভি ডট কম।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন