রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা কি রোগের লক্ষণ জটিলতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা কি রোগের লক্ষণ জটিলতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ

ছবি: Ai

বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা কেবল একটি খারাপ স্বপ্নের অভিজ্ঞতা নয়, এটি জটিল মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকির স্পষ্ট লক্ষণ হতে পারে। ঘুমের ঘোরে হঠাৎ মনে হতে পারে কেউ তীব্র গতিতে তাড়া করছে, নয়তো কাছের কোনো মানুষ চরম বিপদে পড়েছেন কিংবা নিজের জীবন মারাত্মক কোনো অচলাবস্থায় আটকে গেছে। এমন ভয়াবহ দৃশ্য দেখে বুক ধড়ফড় করতে করতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের জীবনেই ঘটে। কিন্তু ঘুম ভাঙার পরও যদি মনের ভেতর চেপে বসা দীর্ঘস্থায়ী ভয় ও আতঙ্ক কিছুতেই না কাটে, তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি সাধারণ কোনো নিদ্রাহীনতা নয়।

এটি হতে পারে দুঃস্বপ্নজনিত ঘুমের দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি, যা চিকিৎসাশাস্ত্রে নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার (Nightmare Disorder) নামে পরিচিত।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকের তথ্যমতে, মাঝেমধ্যে কোনো ভীতিকর স্বপ্ন দেখা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। বিশেষ করে তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এই ধরনের স্বপ্ন দেখার প্রবণতা বেশি শুরু হয় এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিকভাবে কমে আসে। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে এটি প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে পৌঁছানোর পরও অব্যাহত থাকে, এমনকি সারা জীবনই বয়ে বেড়াতে হতে পারে। এক বা দুইবার ভয়ের স্বপ্ন দেখলেই কাউকে এই রোগে আক্রান্ত বলা যায় না। কিন্তু দুঃস্বপ্ন যখন বারবার ফিরে আসে, তীব্র মানসিক অস্বস্তি ও যন্ত্রণা তৈরি করে, স্বাভাবিক ঘুমে বিঘ্ন ঘটায় এবং দিনের বেলার কাজকর্মে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখনই চিকিৎসকেরা একে ক্লিনিক্যাল রোগ হিসেবে বিবেচনা করেন।

ঘুমের দ্বিতীয়ার্ধে মানুষের দুঃস্বপ্ন দেখার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়।

কারণ এই নির্দিষ্ট সময়ে মানুষের মস্তিষ্কে র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম স্লিপের ব্যাপ্তি তুলনামূলক বেশি থাকে। এই জটিল স্তরেই সাধারণত ভীতিকর স্বপ্নগুলো তৈরি হয়। কোনো কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে একই রাতে কয়েকবার এমন স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেতে পারে। স্বপ্নগুলো অত্যন্ত জীবন্ত, সুস্পষ্ট ও বাস্তব মনে হয়, যার কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুতে থাকে চরম বিপদ, প্রাণনাশের হুমকি বা গভীর অস্বস্তিকর কোনো পরিস্থিতি। স্বপ্ন যত সামনের দিকে এগোয়, তা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে থাকে। এর ফলে তীব্র ভয়, উদ্বেগ, রাগ, গভীর দুঃখ কিংবা ঘৃণার মতো অনুভূতি নিয়ে রোগীর ঘুম ভেঙে যায়। সেই সাথে প্রচণ্ড ঘাম হওয়া, দ্রুত হৃদস্পন্দন এবং জেগে ওঠার পর স্বপ্নের প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁতভাবে মনে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। ঘুম ভাঙার পর পুনরায় ঘুমাতে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডারকে এক ধরনের প্যারাসমনিয়া (Parasomnia) বা নিদ্রাকালীন আচরণগত অসঙ্গতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। তবে এর পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়, বরং বেশ কয়েকটি শারীরিক, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক অনুঘটক কাজ করে।

দৈনন্দিন জীবনের তীব্র মানসিক চাপ ও উৎকণ্ঠা দুঃস্বপ্নের অন্যতম প্রধান উৎস। কর্মক্ষেত্র, পরিবার বা শিক্ষাজীবনের অস্থিরতা, বাসা পরিবর্তন কিংবা পরিবারের কোনো প্রিয়জনের আকস্মিক মৃত্যুর মতো মানসিক আঘাত এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এছাড়া অতীতে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক আঘাত, যৌন হয়রানি কিংবা যে কোনো গভীর ট্রমার কারণে তৈরি হওয়া পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুঃস্বপ্নের শিকার হন।

ঘুমের সময়সূচির অনিয়ম, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং দীর্ঘস্থায়ী অনিদ্রার মতো সমস্যাও দুঃস্বপ্নের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পাশাপাশি বিভিন্ন জীবনরক্ষাকারী ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও দুঃস্বপ্ন দেখা দিতে পারে। বিষণ্নতার চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের নির্দিষ্ট ওষুধ ও বিটা ব্লকার, পারকিনসনস রোগের ওষুধ এবং ধূমপান ছাড়তে ব্যবহৃত কিছু ওষুধ মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে দুঃস্বপ্ন ডেকে আনে। বিষণ্নতা, হৃদ্‌রোগ, ক্যানসার এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। অনেকের ক্ষেত্রে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে ভৌতিক বই পড়া, ভীতিকর চলচ্চিত্র দেখা কিংবা মানসিকভাবে অস্বস্তিকর কোনো সংবাদ দেখার ফলেও অবচেতন মনে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পারিবারিকভাবে ঘুমের সমস্যা বা দুঃস্বপ্নের ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে।

দুঃস্বপ্নজনিত এই ব্যাধি দীর্ঘায়িত হলে একজন মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসে।

দিনের বেলায় অনবরত ক্লান্তি ও ঘুম ঘুম ভাব তৈরি হয়, যার ফলে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একাগ্রতা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি পরিচালনার ক্ষেত্রে মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। বারবার অস্বস্তিকর স্বপ্নের স্মৃতি মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়ায় মেজাজ খিটখিটে হয় এবং স্থায়ী বিষণ্নতা চেপে বসে। পুনরায় দুঃস্বপ্ন দেখার আশঙ্কায় অনেকে রাতে বিছানায় যেতে ভয় পান, যার ফলে অনিদ্রার সমস্যা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়তে থাকে। এমনকি পরিবারের সদস্য বা একই বিছানায় থাকা সঙ্গীর ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, দুঃস্বপ্নজনিত তীব্র মানসিক যন্ত্রণা দীর্ঘস্থায়ী হলে রোগীর ভেতর আত্মহত্যার প্রবণতা বা আত্মবিধ্বংসী চিন্তা জাগ্রত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, মাঝেমধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখা সাধারণ অভিজ্ঞতা হলেও তা যদি নিয়মিত রূপ নেয়, তবে কোনোভাবেই অবহেলা করা চলবে না। প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হলে, অন্ধকার বা ঘুমানোর পরিবেশ নিয়ে ভীতি তৈরি হলে এবং আচরণগত অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে অবিলম্বে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বা স্লিপ মেডিসিন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা অপরিহার্য বলে জানিয়েছে দিনাজপুর টিভি ডট কম।