মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬,
আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বাস্থ্য

বারবার ব্যর্থতায় আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকার

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০১:৪৫ পিএম

বারবার ব্যর্থতায় আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার কারণ ও প্রতিকার

বারবার ব্যর্থতায় আত্মবিশ্বাস ভেঙে পড়া মানুষের খুব চেনা এক মানসিক সংকট।

একবার প্রত্যাশা পূরণ না হলে মানুষ হয়তো নিজেকে সান্ত্বনা দেয় যে সামনের বার নিশ্চয়ই ভালো কিছু ঘটবে। তবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে নিজের সামর্থ্য নিয়ে গভীর সংশয় মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যে ব্যক্তি অতীতে নিজের দক্ষতা নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন, তিনিও একটা পর্যায়ে ভাবতে শুরু করেন যে তাকে দিয়ে আসলেই কোনো কাজ হবে কি না। প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষা, ব্যবসায় ক্রমাগত লোকসান, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিচ্ছেদ কিংবা দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পরও লক্ষ্য পূরণ না হওয়া—এমন অভিজ্ঞতা শুধু তাৎক্ষণিক মন খারাপ তৈরি করে না, বরং মানুষের আত্মবিশ্বাসকে একেবারে তছনছ করে দেয়।

কোনো নির্দিষ্ট কাজে অকৃতকার্য হওয়া আর ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে ব্যর্থ মনে করা এক বিষয় নয়।

কিন্তু মানসিক চাপে থাকা মানুষ প্রায়ই এই দুটি ধারণাকে গুলিয়ে ফেলে। চাকরির পরীক্ষায় একবার সুযোগ না পেলে কেউ হয়তো প্রস্তুতি আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সেই ঘটনাই বারবার ঘটতে থাকলে তিনি ধরে নেন যে তিনি নিজেই কোনো কাজের যোগ্য নন। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এমন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠার পেছনে মানুষের ভাবনার ধরন বড় ভূমিকা রাখে। জীবনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সব ক্ষেত্রের অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করলে মানসিক দৃঢ়তা ধীরে ধীরে কমে যায়। অথচ যেকোনো ব্যর্থতার পেছনে প্রস্তুতির ঘাটতি, সুযোগের সীমাবদ্ধতা, তীব্র প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক অনটন কিংবা ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের বাইরের অজস্র সমীকরণ কাজ করতে পারে।

একই চেষ্টা বারবার চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলে মানুষ নতুন করে চেষ্টা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তখন অনেকের মনে হয়, এত খাটাখাটনির পরও যখন কিছুই বদলাচ্ছে না, তখন আর বাড়তি চেষ্টা চালিয়ে লাভ কী। মনোবিজ্ঞানে এই মানসিক অবস্থাকে ‍‍`শেখা অসহায়ত্ব‍‍` ধারণার সাথে তুলনা করা হয়। পরিস্থিতির ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই—এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হতে মানুষ একপর্যায়ে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে পরিস্থিতি কখনোই বদলানো সম্ভব নয়। ফলে সামনে স্পষ্ট সুযোগ তৈরি হলেও নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে মানুষ দ্বিধায় ভোগে। তবে সবার ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া একরকম হয় না; ব্যক্তিগত মানসিকতা, পরিবেশগত সহায়তা ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মানুষের অনুভূতির ধরন বদলে যেতে পারে।

অন্যের প্রকাশ্য সাফল্য নিজের ব্যর্থতাকে আরও বহুগুণ বড় করে দেখায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহকর্মী বা বন্ধুদের নতুন কর্মসংস্থান, চাকরিতে পদোন্নতি, বিয়ে, বাড়ি কেনা কিংবা উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর খবর অনবরত সামনে আসে। অন্যের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্তগুলো দেখতে দেখতে নিজের জীবনের না-পাওয়াগুলো আরও করুণ মনে হতে পারে। নিজের কাঙ্ক্ষিত প্রাপ্তি যখন আটকে থাকে, তখন অন্যের অর্জনকে নিজের পিছিয়ে পড়ার প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া শুরু হয়। মানুষের মনে হয় যে চারপাশের সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, কেবল নিজের জীবনটাই এক জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। কিন্তু অন্যের দৃশ্যমান অর্জনের সাথে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের সব গোপন সংগ্রামের তুলনা করা মোটেও বাস্তবসম্মত ভাবনা নয়। সবার সুযোগ, পারিবারিক দায়িত্ব, আর্থিক সক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থান ভিন্ন। তাই অন্যের সাফল্য দিয়ে নিজের জীবনের হিসাব কষতে গেলে হতাশা শুধুই বৃদ্ধি পায়।

ক্রমাগত ব্যর্থতা সমালোচনা ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে তোলে।

ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা মানুষকে শুধু নিজের সামনেই অপরাধী করে না, সমাজের চোখে সে কেমন প্রতিভাত হচ্ছে সেই উদ্বেগেও ভোগায়। আত্মীয়দের অযাচিত প্রশ্ন, পরিচিতদের তির্যক মন্তব্য কিংবা পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার মানসিক যন্ত্রণা মানুষকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলে। এমন অবস্থায় মানুষ নতুন চাকরিতে আবেদন করতে ভয় পায়, নিজের কাজ কাউকে দেখাতে দ্বিধাবোধ করে কিংবা নতুন কোনো উদ্যোগের পরিকল্পনা করলেই কেবল পরাজয়ের আশঙ্কা করতে থাকে। প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ে সুযোগ এড়িয়ে চললে সাময়িকভাবে মানসিক উদ্বেগ কম মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।

আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে হলে প্রথমে কাজের ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত মূল্যের সাথে মেলানো বন্ধ করতে হবে। কোনো কাজে সফল না হওয়ার অর্থ এই নয় যে মানুষের অস্তিত্ব অযোগ্য। বরং ব্যর্থতার পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করতে হবে—কোথায় ত্রুটি ছিল, কোন দক্ষতা বাড়ানো দরকার ছিল এবং কোন বিষয়গুলো নিজের হাতের বাইরে ছিল, তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

বড় কোনো লক্ষ্যকে ছোট ছোট পদক্ষেপে ভাগ করে নেওয়া খুব কার্যকর কৌশল। চাকরির প্রস্তুতিকে মূল লক্ষ্য ধরে নিলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পড়াশোনা করা, একটি নির্দিষ্ট নতুন কাজ শেখা কিংবা নিয়ম মেনে কয়েকটি মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে জীবনবৃত্তান্ত পাঠানোকে নিজের অগ্রগতি হিসেবে দেখতে হবে। এতে চূড়ান্ত সাফল্য আসার আগেই নিজের প্রতিদিনের চেষ্টার স্পষ্ট প্রমাণ চোখের সামনে থাকে।

অতীতে যেসব কঠিন পরিস্থিতি একসময় সফলভাবে সামলানো গেছে, সেগুলো মনে করা দরকার। অতীতে কোনো জটিল কাজের দায়িত্ব পালন করা বা সংকট কাটিয়ে ওঠাও যোগ্যতারই পরিচয় দেয়। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ মানুষের কাছ থেকে সঠিক পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে আগের পরিকল্পনা বদলে নতুন পথ বেছে নেওয়া কিংবা সাময়িক বিরতি টানাও সঠিক সিদ্ধান্তের অংশ।

টানা হতাশা, নিজেকে ক্রমাগত দোষারোপ করা, চরম ঘুমের সমস্যা কিংবা প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম থেকে আগ্রহ উবে যাওয়ার মতো লক্ষণ তৈরি হলে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

জীবনের কোনো একক লক্ষ্য পূরণ না হওয়া মানুষের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না। প্রতিটি প্রচেষ্টাই যে সফল হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে কোথায় পরিবর্তন আনা দরকার, কখন নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হবে এবং কোন মুহূর্তে নিজের প্রতি সহমর্মী হওয়া জরুরি—তা বুঝতে পারাই আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি।