রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষায় খাল খননের মাটি পাবে বৈধ ইটভাটা

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ১০:৪৬ পিএম

কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষায় খাল খননের মাটি পাবে বৈধ ইটভাটা

কৃষিজমির টপসয়েল বা উপরিভাগের উর্বর মাটির সুরক্ষা এবং খাদ্য উৎপাদন হ্রাস ঠেকাতে ইটভাটায় কৃষিজমির মাটির ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধের সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। শনিবার (১৭ অক্টোবর ২০২৬) পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে খাল খননের পর সংগৃহীত উদ্বৃত্ত মাটি বৈধ ইটভাটাগুলোতে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের বিশেষ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে খনন করা মাটির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষিজমির উপরিস্তরের মাটি কেটে ইট তৈরির মারাত্মক প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

উদ্যোগটি সম্পর্কে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে ও পরিবেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য অটুট রাখতে কৃষিজমির টপসয়েল রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। ইটভাটায় অপরিকল্পিতভাবে উর্বর মাটি ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর কৃষিজমি হারাচ্ছে উৎপাদনশীলতা, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বড় অন্তরায়। সরকার এ বছর একটি পাইলট প্রজেক্ট শুরু করছে, যা পরবর্তীতে সারাদেশে আরও বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণ করা হবে।

অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের শুরুতে দেশব্যাপী খাল খনন কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, যেসব এলাকায় খাল খনন করা হবে, সেখানকার জেলা প্রশাসকদের বৈধ ইটভাটার মালিকদের এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খননের উদ্বৃত্ত মাটি নির্ধারিত এসব ভাটায় পৌঁছানো হবে। উর্বর জমি রক্ষায় ইটভাটায় টপসয়েলের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

ইটভাটা মালিক সমিতির নেতাদের ইতোমধ্যে সরকারের এই পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে এবং ভাটাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে প্রচলিত পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে কংক্রিট ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও খাল খননে কিছু প্রাকৃতিক জটিলতা থাকলেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে এই পরিকল্পনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

মাটিবিজ্ঞানীদের মতে, উপরিভাগের পুষ্টিকর মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান জানান, জৈব উপাদান ও খনিজ উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও মাটির ধারণক্ষমতার প্রধান চালিকাশক্তি। টপসয়েল কেটে নিলে দীর্ঘমেয়াদে জমির উর্বরতা নষ্ট হয় এবং সেই জমিতে পুনরায় ফসল ফলাতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে, যা সাধারণ কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এদিকে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার জানান, দেশের প্রায় আট হাজার ইটভাটায় কৃষিজমির টপসয়েল ও এর গভীরের মাটি ব্যবহৃত হচ্ছে। একবার টপসয়েল কেটে নিলে তা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ১৫ থেকে ২০ বছর লেগে যায়। ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি জমিতে মারাত্মক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।

তিনি উল্লেখ করেন, পোড়ানো ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্লক ইট নিশ্চিতে সরকার ২০১৯ ও ২০২৫ সালে পরিপত্র জারি করলেও জটিলতার কারণে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে শতভাগ ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মাটি সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের বহুমুখী সুফল একসাথে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির জানান, কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ আইন-২০২৬ অনুযায়ী কৃষিজমি থেকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে তাৎক্ষণিক আর্থিক লাভের আশায় অনেক কৃষক ইটভাটার কাছে এই মাটি বিক্রি করে দেন। কৃষকদের সচেতন করার পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা দরকার।

তিনি আরও বলেন, সারাদেশে চলমান প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচির মাটি ব্যবস্থাপনায় একটি নির্দিষ্ট জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি, যাতে উত্তোলিত মাটি অপচয় না হয়ে বৈধ ভাটায় সরাসরি কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করা যায়।

আইনগত প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পাস হওয়া ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩’ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমতি ছাড়া আবাদি জমির উপরিভাগের মাটি কাটার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

সীমিত কৃষিজমিতে বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্য জোগান নিশ্চিত করতে মাটির উর্বরতা রক্ষা এখন জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য। খাল খনন, পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বৈধ ইটভাটার তালিকা সমন্বয়ের মাধ্যমে সরকারের এই পাইলট উদ্যোগ কৃষি খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে জানিয়েছে দিনাজপুর টিভি ডট কম।