শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬,

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা বৃদ্ধি ও সাংকেতিক ভাষা চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ১৭, ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা বৃদ্ধি ও সাংকেতিক ভাষা চালুর ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার তাদের মাসিক ভাতা আরও বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট করেছেন, রাষ্ট্রের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে এই ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হবে, যাতে এই নাগরিকেরা কিছুটা হলেও স্বাচ্ছন্দ্যে দিনযাপন করতে পারেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির (বিপিকেএস) প্রতিনিধিদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব প্রতিশ্রুতি দেন।

প্রতিবন্ধী নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানোকে সরকার ও সমাজের যৌথ নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নাগরিকেরা সমাজেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের মানবিক অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং মৌলিক প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া অপরিহার্য। অতীতে এ ক্ষেত্রে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি ছিল, তা আন্তরিকতার সাথে দূর করতে বর্তমান প্রশাসন কাজ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সরকারি বিভিন্ন দফতর ও বিচারিক আদালতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সাংকেতিক ভাষা ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি সরকার সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করবে বলে জানান সরকারপ্রধান।

এ বিষয়ে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন ও টেকসই কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারেক রহমান।

তিনি উল্লেখ করেন, তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি এবং বহুমুখী বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সাথে দেখছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণের জন্য তিনি সমাজকল্যাণমন্ত্রীকে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন।

হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে শারীরিক যোগাযোগের অসুবিধা দূর করতে সাংকেতিক ভাষা জানা বিশেষ জনবল নিয়োগের বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

একই সাথে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীদের জন্য নিশ্ছিদ্র আইনি সহায়তা নিশ্চিতের বিষয়েও দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণে সবার আগে সঠিক পরিসংখ্যান জানা প্রয়োজন। এই লক্ষ্যে নির্ভরযোগ্য মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করে সরকারের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হবে।

প্রতিবন্ধী কৃষকদের জন্য বিশেষ কৃষি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বিদ্যমান বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিও সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে বলে আশ্বস্ত করেন তারেক রহমান।

নাগরিকদের অবাধ চলাচলের সুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণপরিবহনে প্রতিবন্ধীদের নিত্যদিনের ভোগান্তি নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীদের চলাচলে পিংক বাসসেবা আরও উপযোগী করার পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য প্রধান শহরে প্রতিবন্ধীবান্ধব বাস নামানোর সম্ভাব্যতা পরীক্ষা করে দেখা হবে।

ভবন নির্মাণের আধুনিক নীতিমালা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী জানান, নতুন ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশ ও স্বচ্ছন্দ চলাচলের উপযোগী অবকাঠামো থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব সুযোগ না থাকলে সংশ্লিষ্ট ভবনের কোনো নকশা অনুমোদন না দেওয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানান তিনি। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে বসে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জাতীয় সংসদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রস্তাব প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, বিষয়টি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ বিবেচনা করা হবে।

তিনি আরও জানান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আইনি সুরক্ষা জোরদারে সমাজকল্যাণ, আইন এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা তাদের আইনি সহায়তা নিশ্চিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রত্যেক নাগরিকের সম্মান ও মর্যাদার সাথে বাঁচার মৌলিক অধিকার রয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যাতে প্রয়োজনীয় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পেয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই সরকার সার্বক্ষণিক কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আব্দুস সাত্তার দুলালের সঞ্চালনায় ৩০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা সরাসরি বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

আলোচনা চলাকালে মো. মহসিন নামের এক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদ প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি ক্যাপ উপহার এনেছেন জানালে সরকারপ্রধান স্বয়ং মঞ্চ থেকে নিচে নেমে এসে তা সানন্দে গ্রহণ করেন। একই সাথে ওই ক্রীড়াবিদের দলকে বিদেশে খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার।

আলোচনা পর্বের সমাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত সব প্রতিনিধি ও বক্তাদের সাথে দলীয় আলোকচিত্রে অংশ নেন।