অক্টোবর ৬, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার জন্য অ্যালার্মের ওপর নির্ভর করার অভ্যাস ত্যাগ করে স্বাভাবিক জৈবঘড়িকে কার্যকর করা সম্ভব। শরীর ও মনের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম, সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এবং প্রাকৃতিক দেহঘড়ির সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করাই এর মূল উপায়। শৈশব বা স্কুলজীবনে সুশৃঙ্খল রুটিনের কারণে শরীরে একটি নির্ভরযোগ্য জৈবঘড়ি গড়ে উঠলেও বয়স বাড়ার সাথে সাথে দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনে মানুষ ঘড়ি বা মুঠোফোনের অ্যালার্মের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দৈনন্দিন কিছু ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে জেগে ওঠার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এতে সকালে ঘুমঘুম ভাব কমে এবং দিনভর মানসিক প্রশান্তি বজায় থাকে।
শরীর ও মস্তিষ্ক কার্যকর রাখতে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে গড়ে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন। তবে ঘুমের চাহিদা সবার ক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস ডালাসের সেন্টার ফর ব্রেইন হেলথের সহকারী অধ্যাপক এবং স্লিপ ইনোভেশন ল্যাবসের সহযোগী পরিচালক ইটি বেন সাইমন জানিয়েছেন, আট ঘণ্টাকে একটি মাঝামাঝি আদর্শ ধরা হলেও কেউ সাত ঘণ্টা ঘুমিয়ে সুস্থ থাকেন, আবার কারো নয় ঘণ্টার দরকার হতে পারে। ব্যক্তিভেদে চব্বিশ ঘণ্টার প্রাকৃতিক সার্কাডিয়ান ছন্দের কারণে এই পার্থক্য ঘটে।
ছুটির দিন বা অ্যালার্ম ছাড়া কাটানো সপ্তাহ নিজের স্বাভাবিক ঘুম ও জেগে ওঠার সময় বোঝার উৎকৃষ্ট সুযোগ হতে পারে। শুধু পর্যাপ্ত ঘুম নয়, নির্দিষ্ট রুটিন মেনে চলাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের স্লিপ অ্যান্ড সার্কাডিয়ান রিসার্চ ল্যাবের সহ-পরিচালক হেলেন বার্গেসের মতে, প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া উচিত যাতে পুরো আট ঘণ্টার প্রয়োজনীয় বিশ্রাম নিশ্চিত হয়। একটি ধারাবাহিক রুটিন তৈরি হলে শরীর নিজে থেকেই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে।
ঘুম ও জেগে ওঠার প্রাকৃতিক চক্র নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলে আলো। অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ির সাথে ঘুমের সময়সূচির মিল থাকলে রাতে দ্রুত ঘুম আসে এবং দিনে শরীর সতেজ থাকে। বেন সাইমনের মতে, প্রাকৃতিক আলো মানুষের হরমোনের ভারসাম্য সরাসরি প্রভাবিত করে। রিজেন্ট ইউনিভার্সিটি লন্ডনের সনদপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী, ঘুম বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আনা জয়েস উল্লেখ করেন, সার্কাডিয়ান ঘড়ির প্রধান নিয়ন্ত্রক উপাদান হলো আলো।
রাতে ঘুমানোর পরিবেশ যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখা প্রয়োজন। এজন্য ব্ল্যাকআউট পর্দা বা চোখের মাস্ক ব্যবহার কার্যকর হতে পারে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই জানালার পর্দা সরিয়ে প্রাকৃতিক আলো ঘরে ঢুকতে দিলে শরীর দিনের সূচনা সম্পর্কে প্রাকৃতিক সংকেত পায়। এ সময় শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা মানুষকে সজাগ করে তোলে এবং দিনের কাজের উপযোগী শক্তি জোগায়।
ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে থেকে শরীর ও মনকে বিশ্রামের জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুত করা উচিত। আনা জয়েসের মতে, এই শিথিলকরণ রুটিনের অংশ হতে পারে সন্ধ্যার ত্বকের যত্ন, দাঁত ব্রাশ করা বা আরামদায়ক পোশাক পরা। এ সময়ে ঘরের আলোর তীব্রতা কমিয়ে আনলে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনের সংকেত পায়, যা দ্রুত ঘুমাতে সাহায্য করে।
ঘরের তাপমাত্রাও ঘুমের স্থায়িত্বে বড় ভূমিকা রাখে। রাতে শরীরের মূল তাপমাত্রা প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা হ্রাস পায়। ঘরে অতিরিক্ত গরম থাকলে ঘুমানো বা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পরিস্থিতি অনুযায়ী পাখা বা শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার এবং হালকা পোশাক বা পাতলা চাদর ব্যবহার করা শ্রেয়। মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেকের নির্বিঘ্ন ঘুমের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যন্ত্রের নীল আলো দিনের আলোর কাছাকাছি তরঙ্গদৈর্ঘ্য তৈরি করায় তা রাতে মস্তিষ্কে বিভ্রান্তিকর সংকেত পাঠায় এবং ঘুমের প্রাকৃতিক সময়কে বাধাগ্রস্ত করে।
আলোর ক্ষতিকর প্রভাবের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় স্ক্রল করার মানসিক অভ্যাস ঘুমকে গভীর হতে দেয় না। ব্যবহারকারীদের একটানা যুক্ত রাখার জন্য তৈরি এই প্ল্যাটফর্মগুলো ডোপামিন স্ক্রলিংয়ের মাধ্যমে ঘুমের সময়কে বিলম্বিত করে। নরওয়ের ৪৫ হাজার শিক্ষার্থীর ওপর ২০২৫ সালে পরিচালিত একটি গবেষণায় অতিরিক্ত মুঠোফোন ব্যবহারের সাথে অনিয়মিত ও নিম্নমানের ঘুমের সরাসরি সম্পর্ক চিহ্নিত করা হয়েছে।
বেন সাইমন জানান, তরুণদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাতের সাথে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার গভীর যোগসূত্র রয়েছে। কারো মানসিক সংকটের ঝুঁকি থাকলে অপর্যাপ্ত ঘুম সেই জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের হিসাবে তরুণদের জন্য অন্তত নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার হলেও প্রায় ৭০ শতাংশ তরুণ সাত ঘণ্টাও ঘুমাতে পারে না। ঘুমের আগে ফোনের ব্যবহার কমাতে নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন ব্লক করা এবং স্ক্রিনের রঙ ধূসর বা গ্রেস্কেল মোডে রূপান্তর করার পদক্ষেপ সহায়ক হতে পারে।
শরীরের বিপাকক্রিয়ার সাথে সার্কাডিয়ান ছন্দের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। তাই ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত রাখা এবং সুনির্দিষ্ট সময়ে খাদ্যগ্রহণ ঘুমের মান উন্নত করে। রাতের খাবার ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা আগে শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হেলেন বার্গেস অ্যালকোহল সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করেন, অ্যালকোহল সাময়িকভাবে তন্দ্রাচ্ছন্নতা তৈরি করলেও তা গভীর ঘুম ভেঙে দেয় এবং মস্তিষ্কের স্মৃতি সংরক্ষণ ও শেখার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ঘুমের বিশেষ স্তরগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
কাজের চাপ, ব্যস্ত সময়সূচি বা মানসিক অস্থিরতার কারণে নিয়মিত ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই এক রাতের মধ্যে হঠাৎ করে সময়সূচি পাল্টে না ফেলে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা উচিত। হেলেন বার্গেসের পরামর্শ, শরীরের সার্কাডিয়ান ব্যবস্থা দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে না। তাই ঘুমানোর ও জেগে ওঠার সময় প্রতিদিন আধা ঘণ্টা করে এগিয়ে এনে ধীরে ধীরে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো উচিত। একবার রুটিন এলোমেলো হলে পূর্বাবস্থায় ফিরতে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হয়। ঘুম কোনো অন-অফ সুইচের মতো তাৎক্ষণিক কাজ করে না, বরং এটি মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে তৈরি হওয়া একটি প্রাকৃতিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন